ব্যুরো নিউজ, ১৯ই মে ২০২৬ঃ ডেভিড অ্যাটেনবরো শতবর্ষে পা দিয়েছেন আর তারই বয়সের পূর্তিকে আরও রঙিন করতে তার সব থেকে বড় অনুরাগী ম্যাক্স ইভান্স ব্রাউনিং  ৯৯টা জন্তু-জানোয়ারের ছবি এঁকেছিল দিন-রাত্তির জেগে। আটখানা এ-থ্রি কাগজ ভরে দিয়েছিল তার ছোট্ট হাতে আঁকা সব রঙবেরঙের জীবজন্তুতে। এ-ছিল তার ডেভিড অ্যাটেনবরোর ৯৯তম জন্মদিনের উপহার!  এ-বছর সেই মানুষটি একশোয় পা দিলেন। প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এর থেকে ভালো উপহার আ কি হতে পারে । তাই ম্যাক্স আরও একটা ছবি জুড়ে দিতে চায় সেই উপহারের পাতায়। ফ্রেডরিক অ্যাটেনবরোর বিশ্বের জন্য স্বয়ং একটি রত্ন । তার জীবনের দিকে তাকালে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে ।

বাবা ফ্রেডরিক অ্যাটেনবরো ছিলেন ইংল্যান্ডের লেস্টার শহরের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিন্সিপাল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়াত ছোট্ট ডেভিড। খুঁজে বের করত কোনও জীবাশ্ম, ডিমের খোলস এবং আরও হরেক প্রজাতির কীটপতঙ্গ, পোকামাকড়। দাদা রিচার্ড ফিল্মের দিকে ঝুঁকলেও ভাই ডেভিডের বরাবরের ঝোঁক প্রাকৃতিক ইতিহাসের দিকে। ১৯৩৬ সালে মাত্র দশ বছর বয়সে ডেভিড দাদার সঙ্গে গ্রে আউলের প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণের বার্তাবাহী ভাষণ শুনেছিলেন। রিচার্ডের কথায়, গ্রে সাহেবের অগাধ পাণ্ডিত্য এবং প্রাকৃতিক পরিবেশকে সুস্থ রাখার প্রত্যয় ডেভিডের মনে গেঁথে গিয়েছিল সেদিনই। জীবনভর সেই সাধনার পথকেই নিজের যাপনপথ করে নিয়েছেন ডেভিড। দাদা রিচার্ডও সেদিনের মুগ্ধতা লালন করেছেন দীর্ঘ সময় ধরে। ১৯৯৯ সালে তাঁর বানানো জীবনী-নির্ভর সিনেমা ‘গ্রে আউল’ সেই মুগ্ধতার কথাই বলে।

১৯৪৫ সালে ডেভিড চলে যান কেমব্রিজে। গ্রাজুয়েশনে তাঁর বিষয় ছিল জিওলজি এবং জুলজি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আবহে ডেভিড যোগ দেন রয়্যাল নেভিতে। এরপর শিশুপাঠ্য বিজ্ঞান বইয়ের এক প্রকাশনা সংস্থায় কিছুদিন কাজ করেন তিনি। সেখানে কাজ বিশেষ মনমতো না-হওয়ায় তা ছেড়ে দিয়ে বিবিসি-র রেডিও সঞ্চালকের পদের জন্য আবেদন করেন। কিন্তু না। রেডিওর সঞ্চালকের কাজটি তিনি পাননি। তবে ওই বিভাগের মুখ্য দায়িত্বে থাকে মেরি অ্যাডামস ডেভিডের বায়োডেটা দেখে উৎসাহিত হন এবং ডেভিডকে বিবিসির টেলিভিশন সার্ভিসে যোগ দিতে বলেন। ১৯৫২ সালে গড়পড়তা ইংল্যান্ডবাসীর মতো ডেভিডদের বাড়িতেও টেলিভিশন নেই তখনও। বিবিসির টক ডিপার্টমেন্টের নন-ফিকশন সম্প্রচারের প্রোডিউসার হলেন ডেভিড। তিনি এই অনুষ্ঠানে নতুন নতুন বিষয় সংযোজন করতে থাকেন। পাল্টে যেতে থাকে বিবিসি টেলিভিশনের উপস্থাপনার ধরন।

মাত্র ২৬ বছর বয়সেই ডেভিড ‘দ্য সিলাকান্থ’ নামের এক ডকুমেন্টরি তৈরি করেন। ৬০-৬৫ মিলিয়ন বছর আগে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া গভীর সমুদ্রের স্তন্যপায়ী প্রাণী সিলাকান্থ। সেই জীবন্ত জীবাশ্মের গল্পকে তিনি বাস্তবে তুলে আনেন তাঁর ছবিতে। ১৯৫৪ সালে আসে ‘জু কোয়েস্ট’ সিরিজ। ততদিনে বিবিসির ন্যাচারাল হিস্ট্রি প্রোগ্রামের সঙ্গে তিনি যুক্ত হয়ে গিয়েছেন। টেলিভিশনের সম্প্রচারে যোগ করছেন নতুন আঙ্গিক, নতুন ভাষা। ‘জু কোয়েস্ট’-এর পাশাপাশি অন্য ডকুমেন্টরি তৈরিতেও মন দিয়েছেন তিনি। একসময় এল ‘ট্র‍্যাভেলার্স টেলস অ্যান্ড অ্যাডভেঞ্চার’ সিরিজ।

১৯৬০ সালে বিবিসি ছেড়ে ডেভিড চলে যান ‘লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিকস’-এ, সোশাল অ্যানথ্রোপলজি নিয়ে স্নাতকোত্তর পড়তে। পড়াশোনার পাশাপাশি চলতে থাকে ডকুমেন্টরি ফিল্মের কাজও। আবার ডাক আসে বিবিসি-টু-এর কন্ট্রোলার হওয়ার জন্য। এর পর পরই ডেভিড তৈরি করেন একের পর এক ডকুমেন্টরি ফিল্ম, ‘এলিফ্যান্টস ইন তানজানিয়া’, তিন ভাগে তৈরি করেন ‘কালচারাল হিস্ট্রি অফ দ্য ইন্দোনেশিয়ান আইল্যান্ড’। নিউ গিনির হারানো উপজাতির সন্ধানে ১৯৭১ সালে তৈরি করলেন ফিল্ম, ‘আ ব্ল্যাঙ্ক অন দ্য ম্যাপ’।

১৯৭৯-এর ‘লাইফ অন আর্থ’ সিরিজ বিবিসির ইতিহাসে এক মাইলফলক। গভীর অনুসন্ধিৎসা, নির্ভুল তথ্য এবং নিত্যনতুন আবিষ্কারের জন্য অ্যাটেনবরো বিজ্ঞানীদেরও আস্থা অর্জন করেন। ‘লাইফ অন আর্থ’-এর তুমুল জনপ্রিয়তার পর ডেভিড আনলেন ‘দ্য লিভিং প্ল্যানেট’ সিরিজ। এখানে তাঁর মূল ফোকাস হল ইকোলজি এবং পরিবেশের সঙ্গে জীবজন্তুর মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। ডেভিডের হাত ধরেই বিবিসি পেল আন্টার্কটিকা ন্যাচারাল হিস্ট্রির অসাধারণ ডকুমেন্টেশন, ‘লাইফ ইন দ্য ফ্রিজার’। ১৯৯৫ সালে গাছদের জীবন নিয়ে তৈরি করলেন ‘দ্য প্রাইভেট লাইফ অফ প্ল্যান্টস’। টাইম ল্যাপস ফোটোগ্রাফির মাধ্যমে গাছের বেড়ে ওঠার এই অসাধারণ ছবি তাঁকে এনে দেয় ‘পিবডি পুরস্কার’। তিন বছরের মাথায় দ্বিতীয় পিবডি পুরস্কারটি আসে পাখিদের জীবনের হালহকিকত নিয়ে তৈরি ‘দ্য লাইফ অফ বার্ডস’-এর সৌজন্যে।

এরপর বিশ্ববাসী মুগ্ধ হয়ে দেখেছে তাঁর ‘লাইফ অফ ম্যামালস’, অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের নিয়ে করা ফিল্ম, ‘লাইফ ইন দ্য উন্ডারগ্রোথ’, সরীসৃপ এবং উভচরদের নিয়ে তৈরি ‘লাইফ ইন কোল্ড ব্লাড’। সামুদ্রিক জীবন নিয়ে ২০০৬ সালে তাঁর তৈরি ফিল্ম ‘দ্য প্ল্যানেট আর্থ’ আজ পর্যন্ত করা সবচেয়ে বড় টেলিভিশন ডকুমেন্টারি এবং বিবিসির ইতিহাসে প্রথম ‘হাই ডেফিনিশন’ ওয়াইল্ড লাইফ সিরিজ। ২০১১ সালের মেরুপ্রদেশের ওপর বানানো জনপ্রিয় সিরিজ ‘ফ্রোজেন প্ল্যানেট’ অ্যাটেনবরোকে পর্দায় এনে উপস্থাপকের ভূমিকায় হাজির করে।

অ্যাটেনবরো এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘৫০ বছর পরেও যদি কেউ এই ফিল্মগুলো দেখে, তাহলে সে বুঝতে পারবে কোন সমৃদ্ধ পৃথিবীতে আমরা বাস করেছি। প্রতিটা ছবির মধ্যে লুকনো আছে সেসব গল্প।’

তাঁর প্রথম জীবনে করা ‘লাইফ অন আর্থ’ সিরিজ শুধুমাত্র এক বিস্ময়-জাগানো ফিল্ম নয়। মানুষের মনে গেঁথে যাওয়া এক অনুভব! কোনও বিদ্যায়তনিক চর্চা যা করতে পারে না, ডেভিডের ফিল্ম তা করে দেখিয়েছে। বিশেষজ্ঞের বিষয়কে একজন অ্যামেচার ন্যাচারালিস্ট হিসেবে তিনি সর্বসাধারণের মনোরঞ্জনের উপাদান করে তুলছেন। ন্যাচারাল সিলেকশন, অ্যাডাপ্টেশন, ইকোলজি– বিবর্তনবাদী জীববিদ্যার এই সব জটিল অধ্যায় শুধুমাত্র তাত্ত্বিক ধারণা হিসেবে নয়, বাস্তবের জৈবিক যাপনচিত্র হিসেবে ধরা দিয়েছে অ্যাটেনবরোর লেন্সে। লিভিংরুমে বসে লক্ষ-কোটি মানুষ অ্যাটেনবরোর সঙ্গে সহজেই পাড়ি দিয়েছেন জটিল বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের অন্দরমহলে। বিবর্তন, পরিবেশ, ইকোলজির মতো ভারী শব্দগুলো অনায়াসে সাধারণের বোধে এবং সংস্কৃতিতে মিশেছে।

তাঁর জীবন-শতকের বেশিরভাগটাই কেটেছে পৃথিবীর প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যের রত্নভাণ্ডারের শোভা উপভোগ করে। তিনি পরের প্রজন্মের ওপর  দিয়ে যেতে চান তা আগলে রাখার গুরুদায়িত্ব। তিনি প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এক মানবিক সংযোগ গড়ে তুলে তাকে সংবেদনশীল করে তোলার প্রয়াস চালিয়ে গিয়েছেন ডেভিড। আর প্রকৃতিকে আগলে রাখতে সংবেদনশীল মন যে সবার আগে দরকার, তা নিজের যাপন থেকেই উপলব্ধি করেছিলেন তিনি। মিডিয়া বা গণমাধ্যমের যে সেক্ষেত্রে অসীম ক্ষমতা, অ্যাটেনবরো তা বুঝিয়ে দিয়েছেন। আজ জলবায়ু পরিবর্তন কিংবা জীববৈচিত্র হারানোর কারণ অনুসন্ধানের চেয়ে তা রোধ করায় মানুষের যা কিছু করণীয়– সেদিকে জোর দিচ্ছেন শতাব্দীর নাগরিক অ্যাটেনবরো।

Article Bottom Widget

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিশ্ব জুড়ে

গুরুত্বপূর্ণ খবর

বিশ্ব জুড়ে

গুরুত্বপূর্ণ খবর