ব্যুরো নিউজ, ১৭ই মার্চ ২০২৬ : সাধারণত দেবতারা বৈরাগ্যের প্রতীক হন, কিন্তু হনুমানজি ব্যতিক্রম। রামায়ণে তিনি কর্মতৎপরতার মূর্ত প্রতীক—যিনি সমুদ্র লঙ্ঘন করেন, লঙ্কা দহন করেন এবং পর্বত তুলে আনেন। তাঁর এই নিরন্তর কর্মযজ্ঞে ক্লান্তি নেই, অহংকার নেই। লাড্ডু হলো সেই শক্তির প্রতীক। এটি অন্য কোনো নরম বা ভঙ্গুর মিষ্টির মতো নয়; এটি ঘন, সুসংহত এবং শক্তিতে ভরপুর। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রেও বেসন এবং ঘি-কে ‘বল্য’ বা শক্তিদায়ক খাদ্য বলা হয়েছে। তাই যখন ভক্তরা শনির দশা বা জীবনের কঠিন লড়াইয়ের সম্মুখীন হন, তখন লাড্ডু অর্পণ করার অর্থ হলো সেই লড়াইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ‘জ্বালানি’ বা মানসিক শক্তি প্রার্থনা করা।
অনাসক্ত মিষ্টতা: আসক্তিহীন ভক্তির শিক্ষা
হনুমানজি পরম ব্রহ্মচারী। তবে কেন তাঁকে মিষ্টি নিবেদন করা হয়? রামচরিতমানস আমাদের শেখায় যে ভক্তি মানে স্বাদ ত্যাগ করা নয়, বরং স্বাদের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করা। লাড্ডু মিষ্টি ঠিকই, কিন্তু এটি জিলিপির মতো রসালো বা আঠালো নয়। এটি খাওয়া হয় দ্রুত এবং উদ্দেশ্যের সাথে, যা হনুমানজির চরিত্রের প্রতিফলন। তিনি সংসারে থেকেও জাগতিক মোহে আবদ্ধ নন। লাড্ডু ভক্তকে শেখায়: জীবনে মিষ্টতা বা আনন্দ উপভোগ করো, কিন্তু তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ো না।
Hanumanji : বজরংবলীর চরণে শ্রদ্ধা: ব্রহ্মচর্য ও শাস্ত্রীয় রীতির তাৎপর্য
দুগ্ধজাত মিষ্টি কেন এড়িয়ে চলা হয়?
দুগ্ধজাত মিষ্টি সাধারণত ‘সোম’ বা শীতল এবং চন্দ্রশক্তির প্রতীক। অন্যদিকে, হনুমানজি হলেন ‘অগ্নি-তত্ত্ব’ প্রধান—যিনি তেজ, সাহস এবং বহির্মুখী কর্মশক্তির আধার। মঙ্গলবার ও শনিবার হলো মঙ্গল ও শনির দিন, যা পরিশ্রম এবং শৃঙ্খলার প্রতীক। ঘি (যা অগ্নি দ্বারা শোধিত) দিয়ে তৈরি লাড্ডু এই তেজস্বী শক্তির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি ভক্তের মধ্যে আলস্য নয়, বরং সংকল্প জাগিয়ে তোলে।
লাড্ডুর গোল আকার: অহংকারহীন পূর্ণতা
ভারতীয় দর্শনে বৃত্ত বা গোল আকার হলো পূর্ণতার প্রতীক, যেখানে কোনো তীক্ষ্ণ প্রান্ত বা অহংকারের বহিঃপ্রকাশ নেই। হনুমানজির শক্তিও ঠিক তেমনই—অসীম কিন্তু আস্ফালনহীন। তিনি কার্য সম্পন্ন করেন এবং নিঃশব্দে শ্রীরামের চরণে মাথা নত করেন। লাড্ডুর গোলাকৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, শক্তি তখনই দিব্য হয়ে ওঠে যখন তা সম্পূর্ণ, সংযত এবং সেবায় সমর্পিত হয়।
Hanumanji : সংকটমোচন হনুমান চালিশা: জ্যোতিষশাস্ত্রের দৃষ্টিতে ১০টি অলৌকিক সুফল
উপসংহার: দেবতার জন্য নয়, ভক্তের আত্মোপলব্ধি
প্রকৃতপক্ষে হনুমানজির খাবারের প্রয়োজন নেই; লাড্ডু প্রয়োজন ভক্তের নিজের জন্য। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় শক্তি যেন উদ্ধত না হয়, আনন্দ যেন পরনির্ভরশীল না হয় এবং কর্ম যেন সশব্দ না হয়। প্রচারের যুগে হনুমানজির এই প্রসাদ আমাদের শান্তভাবে শক্তিশালী হওয়ার এবং নিঃস্বার্থভাবে সেবা করার শিক্ষা দেয়। শতাব্দী ধরে এই ঐতিহ্য টিকে আছে কারণ এটি এক কামড়েই আমাদের সংযম এবং উদ্দেশ্যের পাঠ পড়িয়ে দেয়।


















