ব্যুরো নিউজ, ০২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ : ওঁ নমঃ শিবায়।
আমরা সাধারণত দেবতাদের কথা ভাবলে আমাদের চোখে ভেসে ওঠে সোনার মুকুট, রেশমি বস্ত্র আর বহুমূল্য অলঙ্কারে ভূষিত এক রাজকীয় মূর্তি। কিন্তু দেবাদিদেব মহাদেব এক সম্পূর্ণ ভিন্ন পথের পথিক। তিনি শৌখিন প্রাসাদের বদলে হিমশীতল কৈলাসে বাস করেন, রেশমি বস্ত্রের বদলে অঙ্গে ধারণ করেন পশুর চামড়া, আর গয়নার বদলে তাঁর ভূষণ হলো সাপ ও ভস্ম।
শিবের এই রূপ কি কেবল ভয়ংকর বা অদ্ভুত? না, এর গভীরে লুকিয়ে আছে মানবজাতির জন্য এক মহান শিক্ষা। আসুন জেনে নিই শিবের ব্যাঘ্রচর্ম ও গজচর্ম ধারণের নেপথ্য কাহিনী ও আধ্যাত্মিক মহিমা।
১. ব্যাঘ্রচর্ম: কামনার ওপর নিয়ন্ত্রণ
হিন্দু দর্শন অনুযায়ী বাঘ হলো অদম্য শক্তি, ক্রোধ এবং কামনার প্রতীক। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, দারুকাবনের ঋষিরা একবার শিবকে পরীক্ষা করার জন্য তাঁর দিকে এক হিংস্র বাঘ পাঠিয়েছিলেন। শিব অবলীলায় সেই বাঘটিকে বধ করেন এবং তার চামড়া নিজের বসন হিসেবে গ্রহণ করেন।
এর আধ্যাত্মিক বার্তা অত্যন্ত সরল কিন্তু গভীর—কামনা হলো এমন এক বাঘ যা প্রতিটি মানুষকে শিকার করতে চায়। একে কেবল আচার-অনুষ্ঠান বা শক্তি দিয়ে জয় করা সম্ভব নয়; একে জয় করতে প্রয়োজন সচেতনতা ও অনাসক্তি। শিব যখন বাঘের চামড়ায় বসেন, তখন তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন যে—প্রকৃত ক্ষমতা নিজের ইচ্ছাকে চরিতার্থ করায় নয়, বরং তাকে বশ করায়।
Lord Shiva : গৃহস্থ জীবনে শিবের সান্নিধ্য: মনের শান্তি ফেরাতে ৫টি অব্যর্থ সহজ দৈনন্দিন অভ্যাস
২. গজচর্ম: দর্প ও অহংকার চূর্ণ
শিবপুরাণে আমরা ‘গজাসুর’ নামক এক হস্তী-রূপী অসুরের কথা পাই, যে সারা বিশ্বে ত্রাস সৃষ্টি করেছিল। শিব তাকে পরাজিত করে তার চামড়া দিয়ে নিজের দেহ আবৃত করেন। তাই শিবের আরেক নাম ‘গজচর্মাম্বর-ধর’।
ভারতীয় ঐতিহ্যে হাতি হলো বিশালতা এবং শক্তির দর্পের প্রতীক। ‘মদ’ বা অহংকার যখন মানুষকে অন্ধ করে দেয়, তখন তাকে দমিত করা জরুরি। শিব গজাসুরকে বধ করে বুঝিয়ে দিলেন যে, সত্যের সামনে শক্তিশালী অহংকারও ধুলোয় মিশে যায়। শিব সেই চামড়াটি ফেলে না দিয়ে অঙ্গে জড়িয়েছিলেন, যার অর্থ হলো—জীবনের অন্ধকার অভিজ্ঞতাগুলোকেও আমরা যদি জ্ঞানের আলোয় দেখি, তবে তা আমাদের জীবনের ভূষণ বা শিক্ষায় পরিণত হতে পারে।
৩. ভস্ম ও বৈরাগ্য: নশ্বরতার পাঠ
দেবতারা যেখানে উজ্জ্বল পোশাকে সজ্জিত থাকেন, শিব সেখানে কেন ছাই মাখেন? কারণ ছাই বা ভস্ম আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে একদিন সব কিছুই ধ্বংস হবে। চামড়া আমাদের প্রকৃতির সান্নিধ্যের কথা বলে। শিবের এই রূপ বলে যে সম্পদ, প্রতিপত্তি বা সৌন্দর্য সব কিছুই ক্ষণস্থায়ী। যদি মহাবিশ্বের অধিপতি হয়েও তিনি সাধারণ চামড়া ও ভস্মে সন্তুষ্ট থাকতে পারেন, তবে আমরা নশ্বর বস্তুর মোহে কেন এত আবদ্ধ?
৪. যোগী ও ব্যাঘ্রচর্মের সংযোগ
প্রাচীন যোগশাস্ত্র যেমন ‘হঠযোগ প্রদীপিকা’-তে যোগীদের বাঘের চামড়ায় বসে ধ্যান করার কথা বলা হয়েছে। এর যেমন ব্যবহারিক কারণ আছে (পোকামাকড় বা স্যাঁতসেঁতে ভাব থেকে রক্ষা পাওয়া), তেমনই এর একটি তাত্ত্বিক দিকও আছে। যোগী বাঘের ওপর বসেন এটা বোঝাতে যে, তিনি তাঁর মনের চঞ্চলতা ও পাশবিক প্রবৃত্তিগুলোকে বশ করেছেন। আদিযোগী শিব স্বয়ং এর মাধ্যমে আমাদের সেই পথ দেখান।
Lord Shiva : মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র : শিবের আশীর্বাদে আরোগ্য, সুরক্ষা ও মোক্ষের মহামন্ত্র
৫. বিষ্ণু ও শিব: রক্ষা ও ত্যাগের ভারসাম্য
ভগবান বিষ্ণু রেশমি বস্ত্র ও অলঙ্কারে ভূষিত হয়ে ক্ষীরসমুদ্রে শেষনাগের ওপর শয়ন করেন, যা বিশ্বের শৃঙ্খলা ও ঐশ্বর্যের প্রতীক। অন্যদিকে শিব শ্মশানে বা অরণ্যে ভস্ম মাখা অবস্থায় থাকেন, যা মায়া থেকে মুক্তির প্রতীক। এই দুই রূপ মিলে মহাজাগতিক ভারসাম্য রক্ষা করে। একজন শেখান সংসারে মিলেমিশে থাকার নিয়ম, অন্যজন শেখান মায়া ত্যাগ করে সত্যকে চেনার পথ।
উপসংহার
সাপ যেমন তার খোলস ত্যাগ করে, মানুষকেও তেমনি তার অহংকার ও আসক্তির আবরণ ত্যাগ করতে হয়। শিবের এই ‘ভয়ংকর’ রূপ আসলে আমাদের অন্তরের ভয় ও সীমাবদ্ধতাকে জয় করার অনুপ্রেরণা। তাঁর এই সাজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃত শক্তি অন্যের ওপর আধিপত্য বিস্তারে নয়, বরং নিজের ওপর অধিকার স্থাপনে।


















