lord shiva grant boon to asuras ?

ব্যুরো নিউজ ১০ নভেম্বর ২০২৫ : “নমঃ শম্ভবে চ ময়ো ভবে চ নমঃ শঙ্করায় চ ময়স্করায় চ। নমঃ শিবায় চ শিবতরায় চ॥”

(শম্ভু, যিনি সুখের প্রদাতা; শঙ্কর, যিনি আশীর্বাদের দাতা—তাঁহাকে নমস্কার। শিব, যিনি মঙ্গলস্বরূপ; শিবতর, যিনি সকলের মধ্যে শ্রেষ্ঠ মঙ্গল—তাঁহাকে প্রণাম।)

মহাদেব শিব সনাতন ধর্ম্মের এক রহস্যময় দেবতা। তিনি প্রচলিত ধর্ম্ম ও অধর্ম্মের বিচার হইতে বহু উর্দ্ধে অবস্থিত। অন্যান্য দেবগণ যখন বিশ্বসংসারে ধর্ম্ম সংস্থাপন নিমিত্ত হস্তক্ষেপ করেন, তখন শিব নীরব দ্রষ্টা রূপে বিরাজমান। তিনি দেব এবং অসুর, উভয়ের প্রতিই সমান কৃপাপরবশ—তাঁহার এই নিরপেক্ষতা একটি গভীর প্রশ্ন জাগায়: যাঁহার কাজ সংহার দ্বারা মঙ্গলের পথ সুগম করা, তিনি কেন সেই সকল জীবকে বরদান করেন যাহারা বহুশঃ cosmic balance বা বিশ্ব-ভারসাম্য নষ্ট করিতে উদ্যত হয়?

ইহার উত্তর নিহিত আছে মহাদেবের স্বরূপে। তিনি নৈতিকতার শাসক নহেন, তিনি শুদ্ধ চেতনার শক্তি। তিনি সত্য-মিথ্যা, ভালো-মন্দ ভেদাভেদ করেন না; তিনি কেবল নিবেদন, তপশ্চর্য্যা ও আত্ম-সমর্পণের প্রতি উত্তর প্রদান করেন। যে অসুরেরা তাঁহার বরে বলীয়ান হইয়াছিল, তাহাদের উপাখ্যানগুলি ভক্তি, নিষ্ঠা এবং শক্তির অন্তিম উদ্দেশ্য সম্পর্কে এক গভীর পারমার্থিক সত্য উদ্ঘাটন করে।

 

১. পরম দ্রষ্টা শিবের অবিচল নিরপেক্ষতা

বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে শিবের ভূমিকা অনন্য—তিনি বিষ্ণুর ন্যায় বিধিলিপি সক্রিয়ভাবে পরিচালনা করেন না, অথবা ব্রহ্মার ন্যায় শৃঙ্খলাও প্রতিষ্ঠা করেন না। তিনি সম্পূর্ণ নির্লিপ্ততার প্রতিমূর্ত্তি, শুদ্ধ অস্তিত্বের নীতিতে মূর্ত্ত।

তিনি বরদান করেন পুণ্য বা ধর্ম্মের ভিত্তিতে নহে, বরং তপস্যার তীব্রতার উপর নির্ভর করিয়া। অসুর হউক বা দেব, শিব কেবল আধ্যাত্মিক প্রয়াসের কঠোর নিয়ম দ্বারা আবদ্ধ। তাঁহার এই নিরপেক্ষতা এক গভীর সত্য শিক্ষা দেয়: বিশ্ব কেবল ধার্ম্মিকতাকে নহে, বরং নিষ্ঠা ও কঠোর অধ্যবসায়কে পুরস্কৃত করে।

 

তপস্যার নিয়ম, নীতিবোধের উর্দ্ধে

  • রাবণ, যদিও পরাক্রমশালী অসুর ছিল, সে শিবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভক্তও বটে। তাঁহার আন্তরিক ভক্তি এবং কঠোর তপশ্চর্য্যা তাঁহাকে ঐশ্বরিক আশীর্ব্বাদ লাভে সমর্থ করিয়াছিল, যদিও তিনি সেই শক্তির অপব্যবহার করিয়াছিলেন।
  • ভস্মাসুর ঘোর তপস্যালব্ধ বর লাভ করিয়াছিল। শিব তাঁহার অভিসন্ধি যাচাই না করিয়াই সেই ধ্বংসাত্মক বর প্রদান করেন।

এই নীতিটি মানবজাতির সাদা-কালোয় জগৎকে বিচার করিবার প্রবণতাকে চ্যালেঞ্জ করে—প্রমাণ করে যে শক্তি কেবল সদ্‌গুণের উপর নির্ভর করিয়া প্রদত্ত হয় না, বরং সংকল্পের দৃঢ়তা দ্বারাও লভ্য হয়।

সনাতন ধর্মের মহাজাগতিক সংহতি : বিষ্ণুর অবতার ও নবগ্রহ

২. বরদান যাহা বিশ্বকে পরিবর্তিত করে

রাবণ: অহংকার ও পতনের শিক্ষা

রাবণ কেবল এক রাক্ষসরাজ ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক পণ্ডিত, সঙ্গীতজ্ঞ এবং মহাদেবের পরম ভক্ত। তিনি শিব তাণ্ডব স্তোত্র রচনা করেন এবং স্বীয় মস্তক বলিদান দিয়া অভূতপূর্ব ভক্তি প্রদর্শন করেন। শিব তাঁহার ভক্তিতে মুগ্ধ হইয়া বিপুল ক্ষমতা প্রদান করেন। কিন্তু, তাঁহার পতন ঘটিল অহংকারের কারণে। তিনি নিজেকে অজেয় ভাবিয়া সীতাহরণ করিয়াছিলেন এবং পরিণামে শ্রীরামের হস্তে বিনষ্ট হন।

শিক্ষা: বিনয়বিহীন ভক্তি বিপজ্জনক—ইহা দাম্ভিকতার জন্ম দেয়, আর দাম্ভিকতা বিনাশের কারণ হয়।

 

ভস্মাসুর: যে শক্তি গ্রাস করে

ভস্মাসুর সামান্য অসুর হইলেও কঠোর তপস্যা দ্বারা শিবের আশীর্ব্বাদ প্রার্থনা করে। তুষ্ট হইয়া শিব তাঁহাকে এই বর দেন যে তিনি যাহা স্পর্শ করিবেন তাহাই ভস্ম হইয়া যাইবে। কিন্তু শক্তিমদে মত্ত হইয়া ভস্মাসুর সেই বর শিবের উপরই পরীক্ষা করিতে উদ্যত হয়। তখন বিষ্ণু, মোহিনীর রূপ ধারণ করিয়া, ছলনার মাধ্যমে তাহাকে আপন শক্তি দ্বারাই ভস্মীভূত করেন।

শিক্ষা: জগৎ শক্তি প্রদানে ভেদাভেদ করে না, কিন্তু সেই শক্তিকে জ্ঞানের সহিত ব্যবহার করিবার দায়িত্ব সম্পূর্ণরূপে গ্রহীতার। প্রজ্ঞাবিহীন শক্তি আত্মবিনাশের পথ প্রশস্ত করে।

 

৩. জাগতিক নিয়ম: ফলদাতা শিব, বরদাতা নহেন

শিবের আশীর্ব্বাদ অনুগ্রহ নহে, বরং জাগতিক নিয়মের ফলশ্রুতি। যখন কোনো ব্যক্তি—দেব বা অসুর—কঠোর তপস্যায় নিজেকে উৎসর্গ করে, তখন সে এক মৌলিক সত্যে উপনীত হয়—এই জগৎ অধ্যবসায়কে পুরস্কৃত করিবেই।

শক্তি স্বভাবতই নিরপেক্ষ। একটি তরবারী যেমন রক্ষা করিবার জন্য ব্যবহৃত হইতে পারে, তেমনই ধ্বংস করিবার জন্যও। শিব এই নিরাসক্তির প্রতিরূপ বলিয়াই তিনি সেই শক্তির ব্যবহার বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেন না।

 

শিব কেন অভিসন্ধি জিজ্ঞাসা না করিয়াই বর দেন?

  • বিশ্ব কর্ম্মের নীতিতে পরিচালিত হয়, ব্যক্তিগত বিচার দ্বারা নহে।
  • শিব তপস্যার প্রতিভূ—নিষ্কাম তপস্যা ও ভক্তি সর্বদা ফলপ্রসূ হইবে, সাধকের প্রকৃতি যেমনই হউক।
  • শক্তি সঠিকভাবে প্রয়োগের দায়িত্ব গ্রহীতার, প্রণেতার নহে।

এই নীতি শিক্ষা দেয় যে, বিশ্ব-শৃঙ্খলা কেবল নীতিবোধের উপর নির্ভর করে না, বরং শক্তি, প্রচেষ্টা এবং সংকল্পের উপর নির্ভর করে।

Brahma ; সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার সীমিত উপাসনা: এক বিস্ময়কর রহস্য !

৪. পরম সত্য: ক্ষমতার নহে, মুক্তির সন্ধান

এইসকল উপাখ্যানের মাধ্যমে একটি মৌলিক সত্য পরিস্ফুট হয়: শিবের বরদান, যদিও শক্তিশালী, তথাপি অনিত্য। যে অসুরেরা কেবল ক্ষমতা লাভের চেষ্টা করিয়াছে, তাহারা শেষমেশ ধ্বংস হইয়াছে; কিন্তু যাহারা জ্ঞান অন্বেষণ করে, তাহারা মুক্তি (মোক্ষ) নামক মহৎ ফল লাভ করে।

শিবের নিরপেক্ষতা হইতে প্রাপ্ত সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষা এই যে, কেবল ভক্তিই যথেষ্ট নহে; আত্ম-সচেতনতাও প্রয়োজন। ক্ষমতা বিলীন হয়, রাজ্য ধ্বংস হয়, কিন্তু আত্মার আলোক লাভের অভিমুখে যাত্রা চিরন্তন।

এই কারণে, যখন আপনি মহাদেবের সম্মুখে দণ্ডায়মান, তখন কী প্রার্থনা করিবেন? অস্থায়ী শক্তি, নাকি চিরন্তন জ্ঞান? শিব আপনাকে কোনোটাই অস্বীকার করিবেন না, কিন্তু কেবল একটিই আপনাকে প্রকৃত স্বাধীনতা দান করিবে।

বিশ্ব জুড়ে

গুরুত্বপূর্ণ খবর

বিশ্ব জুড়ে

গুরুত্বপূর্ণ খবর