ব্যুরো নিউজ, ২০শে নভেম্বর ২০২৫ : সনাতন হিন্দু ঘরে তুলসী বৃক্ষ কেবল একটি গাছ নহে, উহা দৈবত্বের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি, নিত্য পূজিত এক দেবসত্তা। এই আরাধনার পশ্চাতে লুকাইয়া আছে এক অতি প্রাচীন ও গভীর উপাখ্যান—দেবী বৃন্দার (তুলসী) অটুট ভক্তি, বিশ্ব-ভারসাম্য রক্ষায় ভগবান শ্রীবিষ্ণুর ভূমিকা এবং কীভাবে তাঁহাদের নিয়তি এক হইয়া হিন্দুধর্মের এক অন্যতম প্রিয় আচার সৃষ্টি করিয়াছিল। তুলসী ও বিষ্ণুর এই কাহিনি প্রকৃতপক্ষে কোনো বিচ্ছেদ বা ক্ষতির ইতিহাস নহে, ইহা রূপান্তর, আস্থা ও চিরন্তন ঐক্যের কাহিনি।
বৃন্দা: সতী সাধ্বী ও ভক্তিমতী স্ত্রী
বৃন্দা ছিলেন বিষ্ণুর একনিষ্ঠ ভক্ত এবং পরম ধার্মিকা। কিন্তু বিধির বিধানে তাঁহাকে অসুররাজ জালন্ধরকে বিবাহ করিতে হইল। বৃন্দার সতীত্ব ও পতিভক্তি এতই অটুট ছিল যে, সেই পুণ্যবলে জালন্ধর দেবগণের নিকটও অজেয় হইয়া উঠিলেন। হিন্দু চিন্তাধারায় ধর্ম, পবিত্রতা ও নারীর সঙ্কল্পের শক্তি যে কী ভীষণ শক্তিশালী হইতে পারে, এই ঘটনা তাহারই সাক্ষ্য দেয়। তাঁহার সতীত্বের বর্ম জালন্ধরকে দুর্দমনীয় করিয়া তুলিল, ফলে দেবলোক ও মর্ত্যলোক বিপন্ন হইয়া পড়িল।
সনাতন ধর্মের মহাজাগতিক সংহতি : বিষ্ণুর অবতার ও নবগ্রহ
বিশ্ব-ভারসাম্য রক্ষা ও শ্রীবিষ্ণুর সঙ্কট
জালন্ধরকে পরাজিত করিতে ব্যর্থ হইয়া দেবগণ শেষে ভগবান শ্রীবিষ্ণুর শরণাপন্ন হইলেন। জগৎকে রক্ষা করিবার জন্য বিষ্ণু এক গুরুতর সিদ্ধান্তে উপনীত হইলেন। কৌশলক্রমে তিনি জালন্ধরের রূপ ধরিয়া বৃন্দার সম্মুখে উপস্থিত হইলেন এবং বৃন্দার সতীত্ব নাশ করিলেন। বৃন্দার পবিত্রতা যেই মুহূর্তে ক্ষুণ্ণ হইল, জালন্ধর তাঁহার দৈব সুরক্ষা হারাইলেন এবং যুদ্ধে নিহত হইলেন। মানবীয় বিচারবুদ্ধিতে এই কার্য যত বেদনাদায়কই মনে হউক না কেন, উহা বিশ্বজগতের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করিল। ইহার মাধ্যমে এই শিক্ষাই পাওয়া যায় যে, cosmic balance বা সৃষ্টির-ভারসাম্য রক্ষায় দেবগণকেও কখনও কখনও এমন বলিদান করিতে হয়, যাহা মানবীয় দৃষ্টিতে ভুল বোঝা যাইতে পারে।
অভিশাপ হইতে দিব্য রূপান্তর
স্বামী ও সতীত্বের প্রতি এই প্রতারণায় বৃন্দার হৃদয় ভাঙিয়া গেল। শোক ও ক্রোধে তিনি শ্রীবিষ্ণুকে অভিশাপ দিলেন যে, তাঁহাকে এক শালিগ্রাম অর্থাৎ পৃথিবীতে পূজিত এক পবিত্র কৃষ্ণ প্রস্তরখণ্ডরূপে পরিণত হইতে হইবে। ইহার পর তিনি মর্ত্যদেহ ত্যাগ করিলে, সেই স্থান হইতে জন্ম নিলেন তুলসী বৃক্ষ। এই অভিশাপই শেষ পর্যন্ত এক মহাশুভে রূপ লইল: বিষ্ণু ও তুলসী হিন্দু পূজা-আচারে অবিচ্ছেদ্যরূপে সংযুক্ত হইলেন। শ্রীবিষ্ণুর চরণে তুলসী পাতা অর্পণ না করিলে যে কোনো নৈবেদ্যই অসম্পূর্ণ রহিয়া যায়, ইহা তাঁহাদের চিরন্তন বন্ধনেরই প্রতীক।
তুলসী বিবাহ: দৈবী মিলনের উৎসব
এই পবিত্র কাহিনিটি প্রতি বৎসর কার্তিক মাসে তুলসী বিবাহ উৎসবের মাধ্যমে মূর্ত হইয়া ওঠে। এই উৎসবে তুলসী বৃক্ষের সহিত শালিগ্রামরূপী শ্রীবিষ্ণুর প্রতীকী বিবাহ সম্পন্ন হয়, যাহা নারী ও পুরুষের দৈবী শক্তির মিলনের ইঙ্গিত দেয়। হিন্দু প্রথায় এই বিবাহের মাধ্যমেই বহু অঞ্চলে শুভ বিবাহ অনুষ্ঠানের সূচনা হয়।
Brahma ; সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার সীমিত উপাসনা: এক বিস্ময়কর রহস্য !
প্রতীক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা
তুলসী-বিষ্ণুর এই উপাখ্যানটি বহু চিরন্তন বার্তা বহন করে:
ভক্তিই দিব্য রূপান্তর: বৃন্দার অসীম আস্থাই তাঁহাকে এক অমর, পবিত্র রূপে উন্নীত করিয়াছিল।
আসক্তি অপেক্ষা ভারসাম্য: বিষ্ণুর কার্য কঠোর হইলেও তাহা ধর্ম ও বিশ্বশৃঙ্খলার পক্ষে অপরিহার্য ছিল।
যন্ত্রণা হইতে পবিত্রতা: অভিশাপ শেষ পর্যন্ত যুগ যুগ ধরিয়া এক পবিত্র আশীর্বাদে পরিণত হইল।
শক্তির মিলন: তুলসী ও বিষ্ণু প্রকৃতি ও দৈবত্বের অবিচ্ছেদ্য বন্ধনকে মূর্ত করিয়া তোলেন।
এই কাহিনি আমাদিগকে স্মরণ করাইয়া দেয় যে, অভিশাপের মধ্যেও নিহিত থাকিতে পারে লুক্কায়িত আশীর্বাদ। বৃন্দার ভক্তি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, তিনি তুলসী রূপে অমরত্ব লাভ করিলেন এবং বিষ্ণুর সহিত তাঁহার বন্ধন আজও প্রতি দিন হিন্দু গৃহে পালিত হয়। এক মুহূর্তে যাহাকে বিশ্বাসঘাতকতা মনে হয়, তাহাই অন্য মুহূর্তে চিরন্তন মিলনে রূপান্তরিত হয়। শ্রীবিষ্ণুর চরণে নিবেদিত তুলসীর প্রতিটি পাতায় এই বার্তাই প্রচ্ছন্ন রহিয়াছে যে, প্রেম, আস্থা ও ভক্তি সকল ব্যথা অতিক্রম করিয়া শাশ্বত দিব্যতায় পরিণত হইতে পারে।



















