ব্যুরো নিউজ, ২৮শে জানুয়ারী ২০২৬ : হিন্দু ধর্মে প্রতিটি পূজা অর্চনার আচার-অনুষ্ঠান গভীর প্রতীকী অর্থে সমৃদ্ধ। এর মধ্যে ‘ঘণ্টা’ বাদন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি সাধারণ কাজ মনে হলেও, বিশ্বাস করা হয় যে ঘণ্টার ধ্বনি আধ্যাত্মিক এবং জ্যোতিষীয় ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে, যা উপাসক, পরিবেশ এবং মহাজাগতিক শক্তির মধ্যে এক অপূর্ব সামঞ্জস্য তৈরি করে।
আধ্যাত্মিক চেতনা ও নেতিবাচকতা দূরীকরণ
আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে ঘণ্টার ধ্বনি দেবতাকে জাগ্রত করার বা আবাহন করার একটি মাধ্যম। পবিত্র শাস্ত্র অনুযায়ী, ঘণ্টার নাদ পবিত্র স্থানে ইতিবাচক শক্তি ও দেবদেবীকে আকর্ষণ করে এবং সমস্ত অশুভ বা নেতিবাচক প্রভাব দূর করে। এই অবিচ্ছিন্ন শব্দ পরিবেশকে শুদ্ধ করে এবং উপাসকের মনকে প্রার্থনা ও ধ্যানের জন্য প্রস্তুত করে তোলে।
Ganeshji : সিদ্ধিদাতার মহিমা: গণেশ দেবের দশটি পবিত্র নামের গভীর তাৎপর্য
জ্যোতিষ শাস্ত্র ও পঞ্চভূতের সংযোগ
জ্যোতিষ শাস্ত্রে ঘণ্টার সাথে পঞ্চভূতের (ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ ও ব্যোম) গভীর সংযোগ রয়েছে। মন্দিরের ঘণ্টাগুলি সাধারণত একটি বিশেষ ধাতু বা সংকরের মিশ্রণে তৈরি হয়, যেখানে তামা, দস্তা, সিসা, সোনা ও রূপার মতো বিভিন্ন ধাতু ব্যবহার করা হয়। মনে করা হয় যে, প্রতিটি ধাতু নির্দিষ্ট কোনো গ্রহ বা জ্যোতিষ্কের প্রতিনিধিত্ব করে। এই ধাতুর সংমিশ্রণ পূজার সময় গ্রহের কুপ্রভাব কমিয়ে শুভ প্রভাব বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে।
একাগ্রতা ও মানসিক প্রশান্তি
ঘণ্টার ছন্দবদ্ধ শব্দ মনের অস্থিরতা কমিয়ে প্রশান্তি আনে। জ্যোতিষীদের মতে, পূজার সময় মন স্থির ও নিবদ্ধ থাকলে গ্রহের শক্তির সাথে গভীর সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়। এটি বাহ্যিক জগতের বিশৃঙ্খলা থেকে মনকে সরিয়ে এনে অন্তরের আধ্যাত্মিক শক্তির দিকে পরিচালিত করে, যার ফলে পূজার ফল অধিক কার্যকরী হয়।
আচারের সূচনা ও সমাপ্তি
পূজার শুরুতে এবং শেষে ঘণ্টা বাজানোর বিশেষ রীতি রয়েছে। অনুষ্ঠানের শুরুতে ঘণ্টা বাজানো হলো পার্থিব জগত থেকে আধ্যাত্মিক জগতে প্রবেশের একটি সংকেত। অন্যদিকে, পূজার শেষে ঘণ্টা বাজিয়ে ইতিবাচক শক্তিকে সেই স্থানে সংহত করা হয় এবং অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
Ganeshji : গণেশ উপাখ্যান: বাধা মোচনের দেবতা ও তাঁর ঐশ্বরিক শিক্ষা
চক্রের সক্রিয়তা ও জীবনযাত্রায় প্রভাব
বিশ্বাস করা হয় যে, ঘণ্টার অনুরণন আমাদের শরীরের ‘আজ্ঞা চক্র’ বা তৃতীয় নয়নকে সক্রিয় করে। এটি মানুষের অন্তর্দৃষ্টি ও আধ্যাত্মিক বোধকে উন্নত করে। নিয়মিত এই পবিত্র ধ্বনির সংস্পর্শে থাকলে মানসিক স্বচ্ছতা ও ভারসাম্য বৃদ্ধি পায়, যা পরোক্ষভাবে সুস্বাস্থ্য, উন্নত সম্পর্ক এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অর্জনে সহায়তা করে।
আধুনিক বিজ্ঞান ঘণ্টার এই শব্দকে এক ধরণের ‘সাউন্ড থেরাপি’ হিসেবে গণ্য করে যা স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত রাখে। তবে হিন্দু ঐতিহ্যে এটি মানুষ ও ঈশ্বরের মধ্যে এক পবিত্র সেতুবন্ধন। ভক্তি এবং জ্যোতিষীয় বিশ্বাসের মেলবন্ধনে ঘণ্টার শব্দ আজও শান্তি, সুরক্ষা এবং গ্রহের ভারসাম্য বজায় রাখার এক অনন্য মাধ্যম।




















