Devi Saraswati vandana

ব্যুরো নিউজ, ২৩শে জানুয়ারী ২০২৬ : সনাতন ঐতিহ্যে দেবী সরস্বতী কেবল জ্ঞান বা শিল্পের দেবী নন, তিনি হলেন চেতনার সেই স্বচ্ছ প্রবাহ যা আমাদের অজ্ঞানের অন্ধকার থেকে পরম সত্যের দিকে নিয়ে যায়। কিন্তু একটি প্রশ্ন প্রায়ই মনে জাগে—কেন সরস্বতী পূজা বা তাঁর আরাধনা প্রধানত দিনের বেলাতেই করা হয়? কেন রাত্রিবেলা তাঁর আরাধনা শাস্ত্র ও ঐতিহ্যে ততটা প্রচলিত নয়? এর উত্তর লুকিয়ে আছে দেবীর স্বরূপ এবং আমাদের চেতনার স্তরের গভীর রসায়নে।


আলো ও জ্ঞানের অভিন্নতা

সরস্বতী হলেন শুভ্রবসনা, স্বচ্ছতা এবং অভিব্যক্তির প্রতীক। ভারতীয় দর্শনে জ্ঞানকে দিবালোকের সাথে তুলনা করা হয়েছে। আলো যেমন বস্তুর স্বরূপকে উন্মোচিত করে, জ্ঞানও তেমনই সত্যকে প্রকাশিত করে।

  • প্রকাশের শক্তি: দেবী সরস্বতী বাগদেবী, অর্থাৎ তিনি বাক ও প্রকাশের অধিশ্বরী। দিন হলো কর্ম ও বহিঃপ্রকাশের সময়, আর রাত হলো লয় বা বিশ্রামের। তাই যখন আমাদের মস্তিষ্ক ও মন সবচেয়ে বেশি জাগ্রত ও সক্রিয় থাকে, তখনই জ্ঞানের দেবীকে আবাহন করা যুক্তিযুক্ত।

  • বর্ণের তাৎপর্য: তাঁর শুভ্র বস্ত্র এবং শ্বেত পদ্ম বিশুদ্ধতা ও স্বচ্ছতার প্রতীক, যা অন্ধকারের বিপরীতে স্থিত। রাত্রিকালীন উপাসনা যেখানে নিগূঢ় রহস্য বা অন্তর্মুখী লয়ের প্রতীক (যেমন কালী পূজা), সেখানে দিনের উপাসনা হলো বুদ্ধির বিকাশ ও সক্রিয় সাধনার প্রতীক।


Maa Saraswati Puja : সরস্বতী পূজা ২০২৬: মুখস্থ বিদ্যার ঊর্ধ্বে আত্মোপলব্ধি ও শৃঙ্খলার এক নতুন সন্ধিক্ষণ

শাস্ত্রীয় বিধান ও উপযুক্ত মুহূর্ত

শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী, সরস্বতী পূজার জন্য ‘পূর্বাহ্ণ কাল’ অর্থাৎ সূর্যোদয় থেকে মধ্যাহ্ন পর্যন্ত সময়কে শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে।

  • বসন্ত পঞ্চমী ও তিথি: তিথি অনুযায়ী বসন্ত পঞ্চমীর পুজো সকালে করার বিধান দেওয়া হয়, কারণ এই সময়েই প্রকৃতির নবজাগরণ ঘটে।

  • ব্রহ্মমুহূর্তের মহিমা: সরস্বতী বন্দনার আদর্শ সময় হলো সূর্যোদয়ের প্রায় দেড় ঘণ্টা আগে, যাকে আমরা ‘ব্রহ্মমুহূর্ত’ বলি। এই সময়ে মন সবচেয়ে শান্ত এবং গ্রহণক্ষম থাকে। এই ব্রাহ্মমুহূর্তে দেবীর আরাধনা করলে স্মৃতিশক্তি ও বুদ্ধিদীপ্ততা বৃদ্ধি পায়।


রাত্রি বনাম দিন: চেতনার ভিন্ন স্তর

মনস্তাত্ত্বিক এবং আধ্যাত্মিক দিক থেকে দেখলে, রাত্রি হলো অবদমিত মন বা সুপ্ত চেতনার সময়। আমরা যখন ক্লান্ত থাকি বা আমাদের মন যখন ঘুমের ঘোরে আচ্ছন্ন হতে থাকে, তখন সক্রিয় জ্ঞানার্জন বা সৃজনশীল কাজ বাধাগ্রস্ত হয়।

১. সক্রিয় বনাম নিষ্ক্রিয়তা: দিনের বেলা উপাসনা আমাদের সক্রিয় বুদ্ধিকে (Active Intellect) সংজ্ঞায়িত করে। রাতে সেই আরাধনা করলে তা অনেক সময় আলস্য বা মানসিক জড়তায় পর্যবসিত হতে পারে।
২. অভ্যাসের পবিত্রতা: ছাত্রছাত্রীদের হাতেখড়ি বা ‘বিদ্যারম্ভ’ অনুষ্ঠান সবসময় সকালেই করা হয়, যাতে এক নতুন এবং উজ্জ্বল শুরুর ইঙ্গিত থাকে।

সরস্বতী বন্দনার শক্তি ও সুফল

সরস্বতী আরাধনার প্রাণ হলো এই বন্দনা। এটি কেবল মন্ত্র নয়, এটি প্রজ্ঞার এক মহাজাগতিক স্তোত্র। নিচে এর মূল সংস্কৃত রূপ ও বাংলা অর্থ দেওয়া হলো:

শ্লোক ১:

যা কুণ্ডেন্দু তুষারহার ধবলা যা শুভ্র বস্ত্রাবৃতা যা বীণা বরদণ্ড মণ্ডিতকরা যা শ্বেত পদ্মাসনা। যা ব্রহ্মাচ্যুত শঙ্কর প্রভৃতিভির্ দেবৈঃ সদা পূজিতা সা মাং পাতু সরস্বতী ভগবতী নিঃশেষ জাড্যাপহা।।

সরলার্থ: যিনি কুন্দ ফুল, চন্দ্র এবং তুষারহারের মতো শুভ্রবর্ণা; যিনি শ্বেত বস্ত্র পরিধান করে আছেন; যাঁর হাত বরদায়ক বীণার দণ্ডে সুশোভিত; যিনি শ্বেত পদ্মে আসীন; ব্রহ্মা, বিষ্ণু (অচ্যুত), শিব প্রভৃতি দেবগণ যাঁর সদা উপাসনা করেন—সেই ভগবতী সরস্বতী আমার মনের সমস্ত জড়তা ও অজ্ঞানতা দূর করে আমাকে রক্ষা করুন।

শ্লোক ২:

শুক্লাং ব্রহ্মবিচার সার পরমামাদ্যাং জগদ্ব্যাপিনীম বীণা পুস্তক ধারিণীমভয়দাং জাড্যান্ধকারাপহাম। হস্তে স্ফটিকমালিকাং বিদধতীং পদ্মাসনে সংস্থিতাম বন্দে তাং পরমেশ্বরীং ভগবতীং বুদ্ধিপ্রদাং শারদাম।।

সরলার্থ: আমি সেই পরমেশ্বরী ভগবতী শারদাকে বন্দনা করি, যিনি শুভ্রবর্ণা, যিনি ব্রহ্মবিদ্যার সারস্বরূপা, যিনি আদিশক্তি এবং সমগ্র বিশ্বে পরিব্যাপ্ত হয়ে আছেন। যাঁর হাতে বীণা, পুস্তক ও স্ফটিকের মালা শোভা পায়; যিনি অভয় প্রদান করেন এবং মূর্খতারূপ অন্ধকার বিনাশ করেন; যিনি পদ্মাসনে উপবিষ্ট হয়ে আমাদের শুদ্ধ বুদ্ধি দান করেন।

দেবীর চরণে যে বন্দনা আমরা অর্পণ করি—“যা কুণ্ডেন্দু তুষারহার ধবলা…”—তা কেবল কিছু শব্দের সমষ্টি নয়, এটি একটি শক্তিশালী আহ্বান।

  • জড়তা বিনাশ: এই মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে আমরা প্রার্থনা করি যাতে আমাদের মনের সকল জড়তা (Ignorance) এবং অন্ধকার দূর হয়।

  • সৃজনশীলতা বৃদ্ধি: শিল্পী, সংগীতজ্ঞ ও গবেষকদের জন্য এই বন্দনা এক অভয়বাণী, যা তাঁদের সৃজনশীল পথকে কণ্টকমুক্ত করে।

  • লক্ষ্য স্থির রাখা: পরীক্ষার আগে বা নতুন কোনো শিক্ষা শুরুর আগে এই বন্দনা মনকে শান্ত রাখে এবং একাগ্রতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।


Vasant Panchami : শুক্ল পঞ্চমী ও ব্রজরেণু: জ্ঞান যখন প্রেমের চরণে সমর্পিত

দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োগ: আপনার করণীয়

প্রথাগত পুজোর বাইরেও প্রতিদিনের জীবনে সরস্বতী তত্ত্বকে মেনে চলা সম্ভব:

  • সকালের উপাসনা: আপনার পড়ার টেবিল বা বাদ্যযন্ত্রটিকে সকালের সতেজ মনে প্রণাম করুন। দিনের প্রথম ভাগেই কঠিন বিষয়গুলো পড়ার চেষ্টা করুন, কারণ তখনই ‘সরস্বতী প্রবাহ’ সবচেয়ে প্রবল থাকে।

  • সরঞ্জামকে শ্রদ্ধা: কলম, বই বা বাদ্যযন্ত্র—যা আপনার জ্ঞানের মাধ্যম, সেগুলিকে পরিষ্কার ও পবিত্র রাখুন। কারণ সরস্বতী কেবল মূর্তিতে নন, এই মাধ্যমগুলোর মধ্যেই বিরাজ করেন।


উপসংহার

সরস্বতী আরাধনা কোনো নিষেধের গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি সামঞ্জস্যের (Alignment) বিষয়। দিনের আলোয় যখন প্রকৃতি ও মন প্রস্ফুটিত হয়, তখনই জ্ঞানের দেবীকে আবাহন করা সবচেয়ে ফলদায়ক। ২০২৬ সালের সরস্বতী পুজোয় আসুন আমরা কেবল প্রথা পালনে নয়, বরং শৃঙ্খলার সাথে সঠিক সময়ে তাঁর আরাধনা করে আমাদের অন্তরের প্রজ্ঞাকে জাগ্রত করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিশ্ব জুড়ে

গুরুত্বপূর্ণ খবর

বিশ্ব জুড়ে

গুরুত্বপূর্ণ খবর