nandi and shiva

ব্যুরো নিউজ, ২৬শে জানুয়ারী ২০২৬ : শিবপুরাণ ও স্কন্দপুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী, নন্দী কেবল মহাদেবের বাহন নন, বরং তিনি ভক্তি ও মোক্ষের এক জীবন্ত বিগ্রহ। ঋষি শিলাদের কঠোর তপস্যার ফলে যজ্ঞকুণ্ড থেকে তাঁর জন্ম। ‘নন্দ’ শব্দ থেকে জাত এই নামটির অর্থই হলো পরমানন্দ এবং শুভত্বের প্রতীক।


অকাল মৃত্যু জয় ও দিব্য রূপান্তর

শৈশবে বরুণ ও মিত্র ঋষির ভবিষ্যবাণী অনুযায়ী নন্দীর আয়ু ছিল অত্যন্ত কম। কিন্তু তাঁর অবিচল শিবভক্তি মহাদেবকে তুষ্ট করে। শিব তাঁকে আলিঙ্গন করে অমরত্ব প্রদান করেন এবং নিজের প্রধান ‘গণ’ হিসেবে নিযুক্ত করেন। এই রূপান্তর কেবল শারীরিক নয়—এটি আসলে ভক্তির মাধ্যমে মর্ত্যের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে দিব্যত্ব লাভের এক আধ্যাত্মিক উপাখ্যান।

Lord Shiva : নিয়তি কি সত্যিই অমোঘ? মহাকালের চরণে মার্কণ্ডেয়র আত্মসমর্পণ


ধর্মের মূর্ত প্রতীক ও মহাজাগতিক শক্তি

কূর্মপুরাণ অনুযায়ী, সৃষ্টিলগ্নে ধর্মের ভার বহন করার জন্য বৃষের সৃষ্টি হয়েছিল। নন্দী ধর্মের চারটি স্তম্ভ—সত্য, শৌচ (পবিত্রতা), দয়া এবং তপস্যা-র ওপর দণ্ডায়মান। শিব যখন নন্দীকে কৈলাসের রক্ষক হিসেবে নিযুক্ত করেন, তখন তিনি আসলে সনাতন ধর্মের স্থিতিশীলতা ও মহাজাগতিক শৃঙ্খলা রক্ষার ভার তাঁর ওপর অর্পণ করেন।


নন্দীকেশ্বর: আদি গুরু ও শিবজ্ঞানের বাহক

লিঙ্গপুরাণের বর্ণনা এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচন করে। এখানে নন্দী কেবল সেবক নন, বরং শিবের প্রথম শিষ্য বা ‘আদি আচার্য’। মহাদেব স্বয়ং তাঁকে শৈব আগম, তন্ত্রবিদ্যা এবং স্থাপত্যবিদ্যার নিগূঢ় জ্ঞান দান করেন। এই জ্ঞানই পরবর্তীতে নন্দীর মাধ্যমে ভৃঙ্গী, পতঞ্জলি এবং ব্যাঘ্রপাদের মতো ঋষিদের কাছে পৌঁছায়। এই গুরু-শিষ্য পরম্পরায় নন্দী স্বয়ং ‘নন্দীকেশ্বর’ রূপে পূজিত হন।


মূর্তিতত্ত্ব ও দৃষ্টিযোগের রহস্য

মন্দিরের গর্ভগৃহে শিবলিঙ্গের দিকে মুখ করে বসে থাকা নন্দীর যে মূর্তি আমরা দেখি, তার গভীর দার্শনিক তাৎপর্য রয়েছে। স্কন্দপুরাণ একে ‘দৃষ্টিযোগ’ বলে অভিহিত করেছে। নন্দীর একনিষ্ঠ দৃষ্টি হলো ‘একাগ্রতা’র প্রতীক। এটি জীবাত্মার (নন্দী) পরমাত্মার (শিব) সঙ্গে লীন হওয়ার আকুলতাকে প্রকাশ করে। এই স্থির দৃষ্টি আমাদের শেখায় যে, আধ্যাত্মিক উত্তরণের জন্য অবিচল লক্ষ্য কতটা জরুরি।


Lord Shiva : দেবীর পরিবর্তে মানবীর সহিত মহাদেবের সংসার গঠিত হল কেন ?

অন্তরের প্রহরী ও প্রার্থনার মাধ্যম

মহাভারতের বর্ণনা অনুযায়ী, নন্দী কেবল কৈলাসের দ্বারপাল নন, তিনি অন্তরের চেতনারও রক্ষক। অহংকার নিয়ে শিবের সান্নিধ্য পাওয়া অসম্ভব—ভীমের দর্প চূর্ণ করার ঘটনাটি তারই প্রমাণ। আবার দক্ষিণ ভারতের লোকজ সংস্কৃতিতে নন্দীর কানে কানে প্রার্থনা বলার যে রীতি আছে, তা আসলে ভক্ত ও ভগবানের মধ্যে এক নিবিড় ও বিশ্বস্ত যোগসূত্র স্থাপনের প্রতীক।


উপসংহার

নন্দী হলেন সেবা, সংযম এবং প্রজ্ঞার এক অপূর্ব সমন্বয়। তিনি আমাদের শেখান যে, সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের (শরণাগতি) মাধ্যমেই একমাত্র পরমেশ্বরের সান্নিধ্য লাভ সম্ভব। স্থিরতা ও ভক্তির মাধ্যমে কীভাবে আধ্যাত্মিক মুক্তি অর্জন করা যায়, নন্দীর জীবন ও দর্শন তারই শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিশ্ব জুড়ে

গুরুত্বপূর্ণ খবর

বিশ্ব জুড়ে

গুরুত্বপূর্ণ খবর