ব্যুরো নিউজ, ২ই মার্চ ২০২৬ : হিন্দু ধর্মে ‘ত্রিমূর্তি’ ধারণাটি জীবন ও অস্তিত্বের এক চিরন্তন চক্রকে তুলে ধরে। ব্রহ্মা (সৃষ্টিকর্তা), বিষ্ণু (পালনকর্তা) এবং মহেশ বা শিব (বিনাশকারী)—এই তিন শক্তির সমন্বয়েই মহাবিশ্বের ছন্দ নিয়ন্ত্রিত হয়। ভগবান শিব তাঁর তীব্র ও শান্ত—উভয় রূপের জন্যই পরিচিত। তিনি একদিকে যেমন অমঙ্গলকে বিনাশ করেন, অন্যদিকে মঙ্গলের পথ প্রশস্ত করতে পৃথিবীকে পুনর্গঠিত করেন। মহাদেবের এই বিশেষ রূপের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো তাঁর গলায় জড়ানো সর্পরাজ ‘বাসুকি’।
শিবের গলায় সর্পরাজ বাসুকির তাৎপর্য
হিন্দু ঐতিহ্যে শিবের গলায় সাপের উপস্থিতি কেবল অলঙ্কার হিসেবে নয়, বরং এর পেছনে গভীর অর্থ নিহিত রয়েছে। সাপ সাধারণত ভয় ও বিপদের প্রতীক, যা মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কিন্তু মহাদেব যখন পরম শান্তিতে সেই ভয়ঙ্কর সর্পকে কণ্ঠে ধারণ করেন, তখন তা ভয়হীনতা ও অসীম শক্তির পরিচয় দেয়। এটি প্রমাণ করে যে, তিনি সমস্ত জাগতিক ভয়ের ঊর্ধ্বে এবং প্রকৃতির প্রতিটি রুদ্র রূপ তাঁর নিয়ন্ত্রণে।
Lord Shiva : নিঃসঙ্গতা কি দণ্ড নাকি দিব্য উপহার? শৈব দর্শনের আলোকে এক বিশ্লেষণ
বিনাশ থেকে নবজাগরণ: সাপের রূপক
সাপের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো খোলস ত্যাগ করা। খোলস ত্যাগের মাধ্যমে একটি সাপ যেন পুনরায় নতুন জীবন ফিরে পায়। এই প্রক্রিয়াটি পরিবর্তনের প্রতীক। শিব যেহেতু বিনাশের দেবতা, তাই তিনি যা ধ্বংস করেন, তা আসলে নতুন সৃষ্টিরই পূর্বাভাস। সাপের এই জীবনচক্র মহাদেবের ধ্বংস ও পুনর্নির্মাণের দর্শনের সাথে হুবহু মিলে যায়। সংক্ষেপে বলতে গেলে, শিবের কণ্ঠে সর্পরাজ নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর প্রতীক:
নির্ভয়তা: মৃত্যু বা বিপদকে জয় করা।
পুনর্নবীকরণ: ধ্বংসের পর নতুন সূচনা।
আত্মনিয়ন্ত্রণ: পাশবিক বা ভয়ঙ্কর প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা।
Lord Shiva : শিবের পরিধেয়: ব্যাঘ্রচর্ম ও গজচর্মের আধ্যাত্মিক রহস্য
মহাদেবের নীলকণ্ঠ ও দিব্য রূপের রহস্য
প্রাচীন বর্ণনা অনুযায়ী মহাদেবের দেহ ভস্ম-শুভ্র হলেও, আধুনিক শিল্পকলায় তাঁকে নীল বর্ণে চিত্রিত করা হয়। তাঁর ললাটে অবস্থিত তৃতীয় নয়ন সাধারণ দৃষ্টির অতীত অসীম চেতনার প্রতীক। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, কামদেব যখন তাঁর ধ্যানভঙ্গ করতে চেয়েছিলেন, তখন শিবের তৃতীয় নয়ন থেকে নির্গত অগ্নি তাঁকে ভস্মীভূত করেছিল। পরবর্তীতে দেবী পার্বতীর অনুরোধে তিনি পুনরায় জীবন ফিরে পান।
বিভূতি ও ত্রিশূলের মাহাত্ম্য
শিবের কপালে ভস্মের তিনটি রেখা দেখা যায়, যাকে বলা হয় বিভূতি। এটি জাগতিক মায়া ও পার্থিব বস্তুর প্রতি অনাসক্তির প্রতীক। এছাড়া তাঁর হাতে থাকা ত্রিশূল কেবল একটি অস্ত্র নয়; এর তিনটি ফলা সৃষ্টি, স্থিতি ও বিনাশের ভারসাম্য রক্ষা করে। এই তিন শক্তির মাধ্যমেই মহাবিশ্বের ছন্দ বজায় থাকে।



















