ব্যুরো নিউজ, ২০শে জানুয়ারী ২০২৬ : : আজকের এই অতি-ব্যস্ত ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত যুগে মানসিক ক্লান্তি আমাদের নিত্যসঙ্গী। আমরা যখন রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘ভয়শূন্য চিত্ত’ এবং ‘উচ্চ সেথা শির’-এর আদর্শের কথা বলি, তখন সেই দর্শনের এক জীবন্ত বিগ্রহ হিসেবে আমাদের সামনে ফুটে ওঠে শ্রী হনুমানের অবয়ব। আধুনিক মনস্তত্ত্বের আলোকে হনুমানজি কেবল শারীরিক শক্তির দেবতা নন, বরং তিনি মনের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের এক অনন্য প্রতীক।
মনের গহীনেই শক্তির উৎস
রামায়ণের একটি অত্যন্ত মানবিক দিক হলো হনুমানজির নিজের শক্তি বিস্মৃত হওয়া। জাম্ববান যখন তাঁকে তাঁর অসীম ক্ষমতার কথা স্মরণ করিয়ে দেন, তখন তিনি পুনরায় নিজের শক্তি ফিরে পান। এটি বর্তমান সময়ের ‘ইমপোস্টার সিন্ড্রোম’ বা আত্মবিশ্বাসের অভাবের একটি প্রাচীন মনস্তাত্ত্বিক উদাহরণ। হনুমানজি আমাদের শেখান যে, ক্ষমতা আমাদের ভেতরেই থাকে, কেবল সঠিক মূল্যবোধ ও লক্ষ্যবোধের স্মরণে সেই হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়া এবং শির উচ্চ রাখা সম্ভব।
Hanumanji : কেন সরল ও অনাড়ম্বর ভক্তরাই হনুমানজির সবচেয়ে কাছের?
আবেগ নিয়ন্ত্রণ: দমন নয়, বরং অনুশাসন
আধুনিক থেরাপিতে ‘ইমোショナル রেগুলেশন’ বা আবেগ নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়। হনুমানজি লঙ্কাদহনের সময় ক্রোধ অনুভব করেছিলেন, সীতা মায়ের কষ্টে ব্যথিত হয়েছিলেন, কিন্তু কোনো আবেগকেই তিনি তাঁর বিচারবুদ্ধির ওপরে স্থান দেননি। লঙ্কাদহনের সময় তাঁর সেই সংযম প্রমাণ করে যে, তিনি জানতেন কোথায় থামতে হয়। আবেগ দমিত না করে তাকে সঠিক পথে চালিত করাই হলো প্রকৃত মানসিক সুস্থতার চাবিকাঠি।
ভক্তি যখন মানসিক নোঙর
মনকে শান্ত রাখার জন্য আজকের ‘মাইন্ডফুলনেস’ বা সচেতনতা অভ্যাসের যে চল, তা হনুমানজি কয়েক শতাব্দী আগেই দেখিয়ে গেছেন ‘রাম-নাম’ জপ বা ভক্তির মাধ্যমে। যখন মন কোনো উচ্চতর আদর্শ বা লক্ষ্যে স্থির থাকে, তখন বাইরের বিশৃঙ্খলা তাকে স্পর্শ করতে পারে না। হনুমান চালিশার ছন্দোবদ্ধ পাঠ বা ধ্যান আসলে বিক্ষিপ্ত মনের জন্য একটি সুশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি করে, যা উদ্বেগ কমিয়ে মনে প্রশান্তি আনে।
অহংকারহীন বীরত্ব ও ভয়শূন্য চিত্ত
রবীন্দ্রনাথের ভাষায় শির তখনই উচ্চ থাকে যখন তা অহংকারমুক্ত হয়। হনুমানজি অসাধ্য সাধন করেও নিজেকে শ্রীরামের সেবক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এই বিনয় তাঁকে পারফরম্যান্সের চাপ বা লোকদেখানো সাফল্যের আকাঙ্ক্ষা থেকে মুক্ত রেখেছিল। যখন কোনো ব্যক্তি নিজের কাজের কৃতিত্ব কোনো মহৎ উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে, তখন তার মন থেকে ব্যর্থতার ভয় বা হীনম্মন্যতা দূর হয়ে যায়। হনুমানের নির্ভীকতা কোনো ঔদ্ধত্য থেকে আসেনি, বরং এসেছিল তাঁর স্বচ্ছ উদ্দেশ্য এবং সেবাধর্ম থেকে।
Hanumanji : যন্ত্রণাই আমন্ত্রণ: হনুমানের অপ্রকাশিত উপস্থিতির গোপন রহস্য
উপসংহার: অন্তরের শক্তিই প্রকৃত আরোগ্য
মানুষ আজ হনুমানজির কাছে কেবল রোগমুক্তির জন্য যায় না, বরং মনের জোর ফিরে পেতে যায়। তিনি আমাদের শেখান যে, জীবনের সমস্যাগুলো হয়তো তৎক্ষণাৎ দূর হবে না, কিন্তু সেই সমস্যার মুখোমুখি দাঁড়ানোর মতো মানসিক দৃঢ়তা অর্জন করা সম্ভব। ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য’—সেই স্তরে পৌঁছাতে গেলে হনুমানজির ন্যায় আত্মসংযম, বিনয় এবং একনিষ্ঠ মনোযোগ প্রয়োজন। তিনি কেবল শক্তির উপাস্য নন, তিনি মূলত উচ্চ শির ও সুস্থ মনের এক চিরন্তন আলোকবর্তিকা।




















