ব্যুরো নিউজ, ১৩ই জানুয়ারী ২০২৬ : বাল্মীকি রামায়ণে বর্ণিত আছে, মা সীতা হনুমানকে আশীর্বাদ করে বলেছিলেন— রামচন্দ্রকে বিষ্ণু রূপে, তাঁকে লক্ষ্মী রূপে এবং অযোধ্যাকে বৈকুণ্ঠ রূপে জ্ঞান করতে। এই গভীর আধ্যাত্মিক সত্যকে পাথেয় করেই পবনপুত্র হনুমান যুগে যুগে ধর্মের রক্ষক হিসেবে বিরাজমান। হিন্দু পুরাণ ও দর্শনে হনুমান কেবল এক মহাশক্তিশালী চরিত্র নন, বরং তিনি হলেন সেই পরম সত্তা যিনি সময়ের সীমানা পেরিয়ে প্রতিটি যুগে ভগবানের সান্নিধ্য লাভ করেছেন।
১. অমরত্বের বর: সেবা যখন জীবনের উদ্দেশ্য
লঙ্কা বিজয়ের পর শ্রীরামচন্দ্র যখন সকলকে আশীর্বাদ করছিলেন, তখন হনুমানকে তিনি এক অনন্য বর প্রদান করেন। রামচন্দ্র বলেছিলেন, “পৃথিবীতে যতদিন আমার নাম সংকীর্তন হবে, ততদিন তুমি জীবিত থাকবে।” এটি কেবল কোনো দীর্ঘায়ু হওয়ার আশীর্বাদ ছিল না, এটি ছিল এক মহৎ উদ্দেশ্য—যতদিন ভক্তি থাকবে, ততদিন হনুমান অদৃশ্যভাবে ভক্তের পাশে বিরাজ করবেন। হনুমানের এই ‘চিরঞ্জীব’ অবস্থা কোনো অলস উপস্থিতি নয়, বরং যেখানেই রামকথা আলোচিত হয়, সেখানেই তিনি সুক্ষ্ম শরীরে উপস্থিত থেকে ভক্তি রক্ষা করেন।
Hanumanji : যন্ত্রণাই আমন্ত্রণ: হনুমানের অপ্রকাশিত উপস্থিতির গোপন রহস্য
২. রাম থেকে কৃষ্ণ: অবতার বদলেছে, বদলায়নি ভক্তি
ত্রেতা যুগ পেরিয়ে দ্বাপর যুগে যখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অবতীর্ণ হলেন, তখনও হনুমান তাঁর আরাধ্যের টানে দ্বারকায় উপস্থিত হয়েছিলেন। কথিত আছে, শ্রীকৃষ্ণ যখন হনুমানকে পরীক্ষা করার জন্য প্রশ্ন করেছিলেন, “তুমি রামকে ছেড়ে কেন কৃষ্ণের কাছে এসেছ?” হনুমান বিনীতভাবে উত্তর দিয়েছিলেন যে, তিনি রাম আর কৃষ্ণের মধ্যে কোনো বিভেদ দেখেন না। কারণ, যেখানেই ধর্ম, সেখানেই তাঁর প্রভু। সেই মুহূর্তে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর বিশ্বরূপ প্রদর্শন করেন, যার মধ্যে রাম ও সীতার ছবি ফুটে উঠেছিল। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, অবতারের রূপ পরিবর্তন হলেও পরমাত্মার সঙ্গে ভক্তের যোগসূত্র কখনো ছিন্ন হয় না।
৩. কেন কেবল হনুমানই যুগান্তরের সাক্ষী?
হনুমান হলেন ‘বায়ুপুত্র’। আধ্যাত্মিক দিক থেকে বায়ু বা প্রাণবায়ু হলো জীবনের মূল ভিত্তি, যা সর্বত্র বিদ্যমান এবং ক্ষয়হীন। ঠিক যেমন বাতাস ছাড়া জীবন অসম্ভব, তেমনি ভক্তি ও সেবার প্রাণশক্তি হিসেবে হনুমান প্রতিটি যুগে বর্তমান। তিনি ‘প্রাণ’ শক্তির প্রতীক, যা মহাবিশ্বকে ধারণ করে রাখে। তাই সৃষ্টির প্রলয় না হওয়া পর্যন্ত তাঁর এই অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার নয়।
৪. কলিযুগের জাগ্রত দেবতা
বর্তমান অস্থির সময়ে বা কলিযুগে হনুমানকে ‘জাগ্রত দেবতা’ বলা হয়। হনুমান চালিশায় উল্লেখ আছে, যারা শুদ্ধ চিত্তে তাঁর স্মরণ নেয়, তারা সমস্ত ভয় ও শোক থেকে মুক্তি পায়। দক্ষিণমুখী হনুমান মন্দিরগুলি মূলত অশুভ শক্তির হাত থেকে মানবজাতিকে রক্ষার প্রতীক। তিনি কেবল শারীরিক শক্তির আধার নন, তিনি সাহস, ধৈর্য এবং আত্মসংযমেরও শিক্ষক।
Hanumanji : হনুমান চালিশা: ৪০ দিনের অভ্যাসে মন ও আত্মার রূপান্তর
৫. ভক্ত ও ভগবানের মিলনের সেতু
হনুমান হলেন সগুণ (রূপধারী ঈশ্বর) এবং নির্গুণ (নিরাকার ব্রহ্ম) দর্শনের মিলনস্থল। তিনি শ্রীরামের সেবা করেছেন পরম অনুগত হয়ে, আবার অদ্বৈত জ্ঞানে উপলব্ধি করেছেন যে তিনি ও তাঁর প্রভু অভিন্ন। রামচরিতমানসে রামচন্দ্র বলেছেন, “তুমি আমার নিজের আত্মার মতোই প্রিয়।” হনুমানের অমরত্ব আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, যখন সেবা প্রেমে রূপান্তরিত হয় এবং প্রেম সত্যে বিলীন হয়, তখন ভক্ত নিজেই শাশ্বত হয়ে ওঠেন।
উপসংহার
হনুমানের জীবন আমাদের শেখায় যে ভক্তি সময়ের চেয়েও শক্তিশালী। যুগ বদলায়, সমাজ বদলায়, এমনকি ঈশ্বরের রূপও বদলায়; কিন্তু ভক্তের হৃদয়ের ব্যাকুলতা অপরিবর্তিত থাকে। আজ আমরা যে সাহস বা বিশ্বাসের ওপর ভর করে প্রতিকূলতা পার করি, সেই শক্তির নামই হনুমান। যতদিন রাম-নাম উচ্চারিত হবে, হনুমান আমাদের প্রত্যেকের অন্তরে বীরত্ব আর ভক্তির আলোকবর্তিকা হয়ে বেঁচে থাকবেন।



















