secret to positive in negative hanuman chalisa

ব্যুরো নিউজ ১১ নভেম্বর ২০২৫ : তুলসীদাস বিরচিত শ্রীহনুমান চালিসা-র প্রারম্ভিক দোঁহাটি এক গভীর আধ্যাত্মিক সত্যের উদঘাটন করে:

“শ্রীগুরু চরন সরোজ রজ, নিজ মন মুকুর সুধারি। বরনঊঁ রঘুবর বিমল জসু, জো দায়ক ফল চারি॥”

তুলসীদাস প্রথমে কোনো বীরত্বের জয়গান করেন নাই, বরং গুরুচরণে আত্মসমর্পণের কথা বলিয়াছেন। এই আত্মসমর্পণই প্রকৃত অন্তঃ-রূপান্তরের সোপান। তিনি মনের উপর জোর করিয়া নিয়ন্ত্রণ বা তথাকথিত ইতিবাচক চিন্তার কথা বলেন নাই, বরং “নিজ মন মুকুর সুধারি” — অর্থাৎ, নিজের মনেরূপ দর্পণটি পরিষ্করণ করিবার কথা বলিয়াছেন। মনকে কোনো বিশেষ প্রকারে চিন্তা করিতে বাধ্য না করিয়া, সত্যকে প্রতিফলিত করিবার জন্য প্রস্তুত করাই ইহার উদ্দেশ্য। এই প্রজ্ঞা আধুনিক সময়ের জন্য বিশেষ প্রয়োজনীয়।

 

নিরন্তর ইতিবাচক চিন্তার ভ্রম

বর্তমানের তথাকথিত আত্ম-উন্নয়ন জগতে একটি প্রলোভনময় ধারণা প্রচলিত: “সর্বদা ইতিবাচক চিন্তা করিতে হইবে।” এই ধারণাটি এই বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত যে, আপনার চিন্তা আপনার জীবনকে গঠন করে, সুতরাং সর্বক্ষণ ইতিবাচক থাকিলেই প্রাচুর্য, প্রেম, সাফল্য ও শান্তিকে আকর্ষণ করা যাইবে।

কিন্তু এই মানসিকতা শান্তি নহে, বরং অতিরিক্ত উদ্বেগ সৃষ্টি করে। কারণ যখন আপনি সর্বক্ষণ ইতিবাচক থাকিতে পারেন না (এবং কোনো মানুষই পারে না), তখন আপনার মধ্যে অপরাধবোধ, লজ্জা ও ভয় জন্ম লয়। ইতিবাচক হইবার প্রচেষ্টাই পরিশেষে আত্ম-নিন্দা ও নেতিবাচক আত্ম-বিচারে পর্যবসিত হয়। মানুষ তখন আপন মনকে ভয় করিতে শুরু করে।

সনাতন ধর্মের মহাজাগতিক সংহতি : বিষ্ণুর অবতার ও নবগ্রহ

মন কি বাস্তবিকই নিয়ন্ত্রিত?

আপনাকে সততার সহিত প্রশ্ন করিতে হইবে: আপনার মন কি সত্যই আপনার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে?

উত্তর হইল: নহে। আমাদের অধিকাংশ চিন্তা বিনা আমন্ত্রণে উদিত হয়। সেগুলি আসে অবচেতন হইতে, অতীত সংস্কার (সংস্কারে) হইতে, এবং অনেক সময় বহির্জগৎ হইতে। আপন সকল চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করিবার চেষ্টা করা যেন খালি হাতে সমুদ্রের প্রতিটি তরঙ্গকে নিয়ন্ত্রণ করিবার বৃথা প্রয়াস। এটি অসম্ভব এবং অস্বাস্থ্যকরও বটে। বেদ মনকে “মনোবৃত্তি” বা অস্থিরতা বলিয়া বর্ণনা করিয়াছে। যোগসূত্রও ইতিবাচক চিন্তার দ্বারা মনকে নিয়ন্ত্রণ করিতে বলে নাই। তাহা অভ্যাস (অনুশীলন) ও বৈরাগ্য (অনাসক্তি) দ্বারা এই চিত্তবৃত্তির নিরোধ করিতে বলিয়াছে।

 

উপেক্ষা করুন, যুক্ত হইবেন না: অনাসক্তির রহস্য

ইতিবাচক চিন্তা কেবল একটি মুখোশ বা অভিনয়, যা সময়ক্রমে অসহনীয় হইয়া উঠে। কার্ল ইয়ুং বলিয়াছেন: “যাহা আপনি প্রতিরোধ করেন, তাহাই স্থায়ী হয়।”

তাহলে সুস্থ বিকল্পটি কি? ইতিবাচক চিন্তা করিবার চেষ্টা না করিয়া, মনকে উপেক্ষা করিতে শিখুন।

যখন কোনো অবাঞ্ছিত চিন্তা উদিত হয়— তাহার সহিত যুদ্ধ করিবেন না। বিশ্লেষণ বা অনুসরণ করিবেন না। ভালো বা মন্দ বলিয়া বিচার করিবেন না। মহাসড়কের উপর দিয়া চলন্ত গাড়ির ন্যায় উহাকে কেবল যাইতে দিন। আপনার চিন্তাকে মনোযোগ দেওয়া হ্রাস করুন।

ইহা পলায়নবাদ নহে। ইহা উদাসীনতার মাধ্যমে চিত্তের উপর কর্তৃত্ব স্থাপন। যাঁহাকে বারবার উপেক্ষা করা হয়, তিনি যেমন কথা বলা থামাইয়া দেন, আপনার চিন্তারাও আপনার মনোযোগের উপর হইতে তাহাদের দখল কমাইয়া দিবে। ইহা মনকে নিয়ন্ত্রণ নহে। ইহা মুক্তি

 

 হনুমান চালিসা: পৃষ্ঠতলীয় নিশ্চয়তা নহে, গভীর রূপান্তর

তুলসীদাস আমাদিগকে কোনো মানসিক কৌশল দেন নাই, তিনি দিয়াছেন আধ্যাত্মিক অনুশীলন। তিনি বলেন নাই, “জোর করিয়া মনকে পবিত্র কর।” তিনি বলিয়াছেন, “আগে দর্পণটি পরিষ্কার কর। তারপর ঐশ্বরিক সত্ত্বাকে প্রতিফলিত হইতে দাও।”

“নিজ মন মুকুর সুধারি” — এই পরিষ্করণ হয় ভক্তির মাধ্যমে, স্মরণের মাধ্যমে, এবং দিব্য নাম জপের মাধ্যমে।

ইহা কেবল উপর-উপরের নিশ্চয়তা নহে। ইহা গভীর মূলে প্রোথিত সংস্কার। যখন আপনি সচেতনতার সহিত চালিসা জপ করেন, তখন কেবল শব্দ উচ্চারণ করেন না — আপনি হনুমানের চেতনাকে আহ্বান করেন। তাঁহার নির্ভীকতা, পবিত্রতা, একাগ্রতা, ভক্তি আপনার মনস্তত্ত্বের উপর মুদ্রিত হইতে শুরু করে।

আধুনিক বিজ্ঞান এখন প্রমাণ করিতেছে যে শব্দে শক্তি আছে। পুনরাবৃত্তি মস্তিষ্কের বিন্যাসকে পরিবর্তন করে। জপ দ্বারা স্নায়ু-পদ্ধতি পরিবর্তিত হয়, কর্টিসল হ্রাস পায় এবং মনে নতুন গহ্বর (grooves) সৃষ্টি হয়।

“সংকট সে হনুমান ছুড়াবৈ, মন ক্রম বচন ধ্যান জো লাবৈ॥”

অর্থাৎ, “যিনি মন, কর্ম এবং বাক্যকে ভক্তির সহিত সংযুক্ত করেন, হনুমান তাঁহাকে সকল বাধা হইতে মুক্ত করেন।” এখানে “ইতিবাচক চিন্তা করো” বা “ভয়কে দমন করো” বলা হইতেছে না। এখানে বলা হইতেছে, আপনার সম্পূর্ণ সত্ত্বাকে (মন, বাক্য, কর্ম) ভক্তির পথে পরিচালিত করুন। ইহাই প্রকৃত সমাধান।

Brahma ; সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার সীমিত উপাসনা: এক বিস্ময়কর রহস্য !

আত্মসমর্পণই শক্তি, নিয়ন্ত্রণ শুধু অহমিকা

নিয়ন্ত্রণ হইল অহংকারের পথ। কিন্তু হনুমান চালিসা বলে, মনকে জয় করিবার প্রয়োজন নাই — মনকে শুদ্ধ করিবার প্রয়োজন। আর শুদ্ধি আসে কেবল আত্মসমর্পণের মাধ্যমে, ইচ্ছাশক্তির দ্বারা নহে।

“ভূত পিশাচ নিকট নহিঁ আবৈ মহাবীর জ়ব নাম সুনাভৈ॥”

মানসিক ও অবচেতন স্তরের সকল দুশ্চিন্তা— ভূত-পিশাচের দ্বারা প্রতীকায়িত— হনুমানের নাম শ্রবণে দূরীভূত হয়। ইহা “সুখী চিন্তা করো” নহে। ইহা ঐশ্বরিক শক্তিকে আহ্বান করা, যে কাজটি আপনার অহংকারের দ্বারা কখনও সম্ভব ছিল না।

অন্তরস্থ রামকে (দিব্য আত্মাকে) রক্ষা করিবার ভার হনুমানের (ভক্তি, শৃঙ্খলা, শক্তির) উপর অর্পণ করাই হইল মুক্তি। নিত্য জপের মাধ্যমে মানসিক দর্পণটি নিয়মিত পরিষ্কার হইতে থাকে। এই প্রক্রিয়া “ইতিবাচক চিন্তা” নহে। ইহা মানসিক তপস্যা। ইহা ধীর, বাস্তব এবং স্থায়ী।

বিশ্ব জুড়ে

গুরুত্বপূর্ণ খবর

বিশ্ব জুড়ে

গুরুত্বপূর্ণ খবর