ব্যুরো নিউজ, ২৭শে জানুয়ারী ২০২৬ : আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই এমন সময় আসে যখন যন্ত্রণা বা সমস্যাগুলো অন্তহীন মনে হয়। শারীরিক অসুস্থতা হোক বা মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা ভয়, উদ্বেগ কিংবা অবসাদ—এই পরিস্থিতিগুলো আমাদের ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়। যখন যুক্তি বা ওষুধ সব সময় কাজে আসে না, তখন মানুষ খোঁজে এক অলৌকিক মানসিক শক্তির উৎস। ভারতীয় আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যে এই শক্তির অন্যতম আধার হলো ভক্তি ও প্রার্থনা। আর সেই প্রার্থনার তালিকায় ওপরের দিকেই থাকে হনুমান চালিশা। ভক্তদের বিশ্বাস, পূর্ণ ভক্তি নিয়ে প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় চালিশা পাঠ করলে জীবনের অনেক বড় বাধা ও ভয় দূর হয়।
হনুমান চালিশা আসলে কী?
ষোড়শ শতাব্দীতে কবি ও সন্ত তুলসীদাস এই পবিত্র স্তোত্রটি রচনা করেন। এতে মোট চল্লিশটি পঙ্ক্তি বা ‘চৌপাই’ রয়েছে, যেখানে ভগবান হনুমানের শক্তি, সাহস, বুদ্ধি এবং তাঁর নিঃস্বার্থ ভক্তির বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। হনুমানজিকে ধরা হয় নির্ভীকতা এবং অটল বিশ্বাসের প্রতীক। ভক্তরা বিশ্বাস করেন, তিনি সমস্ত বিপদ থেকে রক্ষা করেন এবং জীবনের কঠিনতম চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়ার সাহস জোগান।
Hanumanji : যন্ত্রণাই আমন্ত্রণ: হনুমানের অপ্রকাশিত উপস্থিতির গোপন রহস্য
বিশেষ দুটি চৌপাই এবং তাদের গুরুত্ব
হনুমান চালিশার সব কটি পঙ্ক্তিই গুরুত্বপূর্ণ, তবে দুটি নির্দিষ্ট চৌপাইয়ের কথা ভক্তরা প্রায়ই বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। এই পঙ্ক্তিগুলো কোনো জাদুমন্ত্র নয়, বরং একাগ্রতার সঙ্গে পাঠ করলে এটি মানুষের মন ও হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলে।
১. রোগ ও শারীরিক-মানসিক যন্ত্রণা মুক্তির জন্য:
“নাসৈ রোগ হরৈ সব পীরা। জপত নিরন্তর হনুমত বীরা॥”
এর সহজ অর্থ হলো—বীর হনুমানের নাম নিরন্তর জপ করলে সমস্ত রোগ এবং গভীর বেদনা দূর হয়। এখানে ‘রোগ’ মানে শুধু শরীরের অসুখ নয়, বরং মানসিক চাপ, দীর্ঘদিনের মনের ক্ষত, রাগ এবং নেতিবাচক চিন্তাকেও বোঝানো হয়েছে। নিয়মিত এই শ্লোকটি পাঠ করলে মন শান্ত হয় এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও পরোক্ষভাবে বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে যাঁরা মানসিক অবসাদ বা দীর্ঘমেয়াদী সমস্যায় ভুগছেন, তাঁদের জন্য এটি বিশেষ ফলদায়ক।
২. ভয় ও নেতিবাচকতা থেকে সুরক্ষার জন্য:
“ভূত পিশাচ নিকট নহিঁ আবৈ। মহাবীর জব নাম সুনাবৈ॥”
এই চৌপাইটির আক্ষরিক অর্থ হলো, মহাবীর হনুমানের নাম স্মরণ করলে কোনো নেতিবাচক শক্তি বা অশুভ প্রভাব কাছে আসতে পারে না। আধুনিক জীবনযাত্রায় ‘ভূত-পিশাচ’ বলতে মনের কুচিন্তা, অকারণ আতঙ্ক (Panic attacks) এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা জনিত ভয়কেও বোঝায়। এটি পাঠ করলে মনে এক অদ্ভুত নিরাপত্তা ও আত্মবিশ্বাস জন্মায়।
বিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে হনুমান চালিশা
মনোবিজ্ঞানের দিক থেকে দেখলে, মন্ত্র জপ করা এক প্রকারের মেডিটেশন বা ধ্যান। যখন আমরা সুর করে একই কথা বারবার বলি, তখন আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক হয় এবং মস্তিষ্কের অস্থিরতা কমে। এটি স্নায়ুতন্ত্রকে শিথিল করতে সাহায্য করে, যার ফলে দুশ্চিন্তা কমে যায়। নিয়মিত পাঠের ফলে মনের যে একাগ্রতা তৈরি হয়, তা আমাদের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।
Hanumanji : সুরক্ষার অলক্ষ্য কবচ: কীভাবে বুঝবেন গভীর নিশিতেও আপনার ওপর বীর হনুমানের আশীর্বাদ রয়েছে?
কীভাবে পাঠ করবেন?
হনুমান চালিশা পাঠ করার জন্য খুব কঠিন কোনো নিয়মের প্রয়োজন নেই। পরিষ্কার জায়গায় শান্ত হয়ে বসে মনোযোগ দিয়ে পাঠ করাই আসল। সকালের পাঠ দিনটি ইতিবাচকভাবে শুরু করতে সাহায্য করে এবং সন্ধ্যার পাঠ সারাদিনের ক্লান্তি ও নেতিবাচকতা দূর করে দেয়। তবে মনে রাখবেন, এটি চিকিৎসার বিকল্প নয়, বরং আধ্যাত্মিক ও মানসিক সহায়ক শক্তি।
উপসংহার
আজকের দ্রুতগামী পৃথিবীতে মানসিক শান্তি পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। হনুমান চালিশা আমাদের সেই হারানো শান্তি ও ধৈর্য ফিরে পাওয়ার সুযোগ করে দেয়। বয়স নির্বিশেষে মানুষ এই স্তোত্র থেকে সাহস পায়। বিশ্বাসের সঙ্গে নিয়মিত অভ্যাস করলে হয়তো বাইরের পরিস্থিতি রাতারাতি বদলাবে না, কিন্তু সেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করার মতো মনের জোরালো কাঠামো তৈরি হবে।




















