ব্যুরো নিউজ, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ : সাধারণ মানুষের ধারণায় দেবী লক্ষ্মী কেবল বৈভব, বিলাসিতা আর আকস্মিক সৌভাগ্যের প্রতীক। আমরা মনে করি, আরাধনা করলেই তিনি স্বর্ণমুদ্রার ঝারি নিয়ে উপস্থিত হবেন। কিন্তু পুরাণ এবং মনোবিজ্ঞান এক সূক্ষ্মতর সত্যের কথা বলে—লক্ষ্মী কেবল বাসনার দাসী নন, তিনি দায়িত্বের (Responsibility) পুরোধা। সম্পদ যেখানে অন্ধভাবে খোঁজা হয়, লক্ষ্মী সেখানে থাকেন না; তিনি সেখানেই স্থিতু হন, যেখানে সম্পদকে সদ্ব্যবহার করার প্রজ্ঞা থাকে।
প্রাচুর্য আসার আগে মা লক্ষ্মী মানুষের মন, আচরণ এবং জীবনযাত্রার ধরন পরীক্ষা করেন। এই পরীক্ষাগুলো অত্যন্ত শান্ত এবং ধীরগতির, যা অনেক সময় আমরা ‘অপেক্ষা’ বা ‘ব্যর্থতা’ বলে ভুল করি। আসলে এগুলি হলো এক একটি ফিল্টার।
১. বর্তমান সম্পদের প্রতি আপনার দৃষ্টিভঙ্গি
লক্ষ্মীর প্রথম পরীক্ষাটি সহজ কিন্তু কঠিন—আপনার কাছে বর্তমানে যা আছে, তার প্রতি আপনি কতটা যত্নশীল? প্রাচুর্য মানেই আধিক্য নয়, বরং ভারসাম্য। যদি কেউ সামান্য সম্পদের অপচয় করেন বা সেটিকে অবহেলা করেন, তবে বড় সম্পদ তাঁর কাছে আসার পথ হারায়। বিশৃঙ্খলা, অপরিচ্ছন্নতা এবং অকারণ ব্যয় আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে সম্পদের প্রতি অসম্মান। মনোবিজ্ঞান বলে, মানুষের আচরণ সব ক্ষেত্রেই এক থাকে—যে অল্প টাকা সামলাতে পারে না, সে কোটি টাকা পেলেও তা ধরে রাখতে পারবে না।
Lakshmi, Goddess of Wealth : লক্ষ্মী দেবীর কৃপা: গৃহে সুখ ও সমৃদ্ধি লাভের ৬টি সহজ উপায়
২. ঐশ্বর্যের পেছনে প্রকৃত উদ্দেশ্য কী?
মা লক্ষ্মী দ্বিতীয় পরীক্ষাটি নেন আমাদের উদ্দেশ্য বা মোটিভেশনের। আপনি সম্পদ কেন চান? স্থায়িত্ব এবং কল্যাণের জন্য, নাকি কেবল নিজের অহংকার (Ego) আর সামাজিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য? অহংকারচালিত সম্পদ অত্যন্ত অস্থির। পুরাণ মতে, যেখানে লোভের আধিপত্য, লক্ষ্মী সেখান থেকে বিদায় নেন। কারণ লোভ কখনো তৃপ্ত হয় না, আর অতৃপ্তি মনে অশান্তি সৃষ্টি করে। যখন অর্থ কেবল আত্মতুষ্টির আয়না হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা বিষাক্ত হয়ে ওঠে।
৩. শৃঙ্খলা ও সুশৃঙ্খল জীবনধারা
মা লক্ষ্মী ভগবান বিষ্ণুর সহধর্মিণী, যিনি মহাবিশ্বের শৃঙ্খলা বা ‘অর্ডার’ বজায় রাখেন। তাই বিশৃঙ্খল জীবনে লক্ষ্মীর স্থান নেই। আপনার দৈনন্দিন রুটিন কেমন? আপনি কি পরিকল্পনামাফিক চলেন নাকি পরিস্থিতির চাপে প্রতিক্রিয়া দেখান? আর্থিক হিসাব রাখা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা এবং নিয়মানুবর্তিতা—এগুলিই হলো সেই বেদী যেখানে লক্ষ্মী স্থায়ী আসন গ্রহণ করেন। শৃঙ্খলা থাকলে সম্পদ বৃদ্ধি পায়, আর বিশৃঙ্খলা থাকলে তা ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।
৪. প্রতিকূলতা ও বিলম্বের মোকাবিলা
অনেকেই মনে করেন অভাব বা দেরি হওয়া মানেই অভিশাপ। কিন্তু এটি আসলে মা লক্ষ্মীর একটি পরীক্ষা। অভাবের সময় আপনি কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন? আপনি কি ভেঙে পড়ছেন, নাকি অনৈতিক পথ অবলম্বন করছেন? ধৈর্য এবং চারিত্রিক দৃঢ়তা না থাকলে লক্ষ্মী সেখানে থাকেন না। সম্পদের চাপ সামলানোর মতো মানসিক শক্তি আপনার আছে কি না, কঠিন সময় সেটিই যাচাই করে নেয়। যারা ধৈর্য না হারিয়ে নৈতিকতা বজায় রাখে, সমৃদ্ধি তাদেরই স্থায়ী সঙ্গী হয়।
Lord Vishnu : কেন বারবার অবতার? হরি অভিশপ্ত না প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ? ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপের গভীরে লুকানো জীবনের সূত্র
৫. সম্পদের প্রবাহ বনাম আসক্তি
লক্ষ্মীর শেষ এবং সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হলো—আপনি কি সম্পদকে আগলে রাখতে চান নাকি প্রবাহিত হতে দেন? লক্ষ্মী মানেই প্রবাহ। সম্পদ যখন এক জায়গায় জমে থাকে বা আটকে রাখা হয়, তখন তা স্থবির হয়ে যায়। এর অর্থ এই নয় যে আপনি বিচারহীনভাবে দান করবেন, বরং এর অর্থ হলো সঠিক বিনিয়োগ, ন্যায্য বিনিময় এবং পরোপকারের মাধ্যমে সম্পদকে সচল রাখা। যারা ভয়ে টাকা আঁকড়ে ধরে রাখে, তাদের মনে অভাবের আতঙ্ক কাজ করে, যা প্রকারান্তরে লক্ষ্মীকে দূরে সরিয়ে দেয়।
উপসংহার: প্রস্তুতির নামই প্রাপ্তি
লক্ষ্মী কেবল ভাগ্যের দেবী নন, তিনি ভারসাম্যের দেবী। তিনি বিশৃঙ্খলা দূর করতে আসেন না, বরং যেখানে শৃঙ্খলা আছে সেখানে প্রবেশ করেন। তাঁর এই পরীক্ষাগুলো আমাদের যোগ্য করে তোলে, যাতে সম্পদ আমাদের ধ্বংস না করে বরং জীবনকে বিকশিত করে। যে পৃথিবীতে আমরা দ্রুত সাফল্যের পেছনে ছুটছি, সেখানে লক্ষ্মীর এই শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—যোগ্যতা বা দায়িত্ববোধ আসার আগেই যদি সম্পদ চলেও আসে, তা আশীর্বাদ নয় বরং অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়।


















