ব্যুরো নিউজ, ৭ই জানুয়ারী ২০২৬ : মানুষের ব্যক্তিত্ব এবং আচরণের গভীরে কাজ করে তিনটি অলক্ষ্য শক্তি, যাকে গীতায় ‘গুণ’ বলা হয়েছে। প্রকৃতির এই তিন উপাদান—সত্ত্ব, রজ এবং তম—আমাদের চিন্তা, কর্ম এবং প্রতিক্রিয়াকলি নিয়ন্ত্রণ করে। এই তিন গুণের খেলা বুঝলে আমরা কেবল নিজেদের চিনতেই পারি না, বরং নিজেদের উন্নতির পথও প্রশস্ত করতে পারি।
১. সত্ত্বগুণ: প্রজ্ঞা ও নির্মলতার আলো
সত্ত্বগুণ হলো শান্তি, স্বচ্ছতা এবং মঙ্গলের প্রতীক। যখন আমাদের মধ্যে সত্ত্বগুণের আধিক্য ঘটে, তখন মন শান্ত হয় এবং আমাদের প্রতিটি কাজ নিঃস্বার্থ হয়ে ওঠে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, সত্ত্বগুণ আত্মাকে সত্য ও মুক্তির সাথে যুক্ত করে। এটি সেই আলো যা আমাদের মায়া বা মোহের অন্ধকার থেকে রক্ষা করে।
কীভাবে সত্ত্ব বৃদ্ধি করবেন: কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, সাত্ত্বিক আহার গ্রহণ, প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটানো এবং প্রতিদিন ধ্যানের মাধ্যমে এই গুণ বৃদ্ধি পায়। ছোট ছোট দয়া বা প্রতিদানের আশা না করে কাউকে সাহায্য করার মাধ্যমেও অন্তরের এই আলো প্রজ্বলিত হয়।
Bhagavad Gita : গীতার আলোকে জীবন দর্শন: নরকের তিন দ্বার থেকে মুক্তির পথ
২. রজোগুণ: কর্মপ্রেরণা ও বাসনার আগুন
রজোগুণ হলো গতির প্রতীক, যা আমাদের স্বপ্ন দেখতে এবং কর্মতৎপর হতে শক্তি যোগায়। এই শক্তি না থাকলে পৃথিবী স্থবির হয়ে যেত। কিন্তু রজোগুণ যখন সত্ত্বগুণকে ছাপিয়ে যায়, তখন মানুষের মধ্যে অস্থিরতা ও অতৃপ্তি দানা বাঁধে। সাফল্যের পেছনে অন্ধভাবে ছোটা বা সর্বদা নিজেকে জাহির করার প্রবণতা এই গুণেরই বহিঃপ্রকাশ।
ভারসাম্য আনার উপায়: রজোগুণকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে কাজের ফলাফল থেকে মনকে সরিয়ে বর্তমান মুহূর্তে মনোনিবেশ করা প্রয়োজন। ধীরস্থিরভাবে আহার করা, অতিরিক্ত উত্তেজনা বর্জন করা এবং ফলের আশা ত্যাগ করে কেবল কর্তব্যের খাতিরে কাজ করলে এই গুণের নেতিবাচক প্রভাব কমে।
৩. তমোগুণ: অজ্ঞানতা ও জড়তার আবরণ
তমোগুণ হলো আলস্য, বিভ্রান্তি এবং স্থবিরতার শক্তি। যখন আমরা বিষণ্ণতা, দীর্ঘসূত্রিতা বা নেতিবাচক চিন্তায় আচ্ছন্ন থাকি, তখন বুঝবেন তমোগুণ প্রাধান্য পাচ্ছে। এটি আমাদের ভেতরের প্রজ্ঞাকে ঢেকে দেয়। তবে সচেতনতার মাধ্যমে এই অন্ধকারকেও জয় করা সম্ভব।
তমোগুণ দূর করার উপায়: সূর্যোদয়ের আগে ঘুম থেকে ওঠা, ঘরবাড়ি ও চারপাশ পরিষ্কার রাখা এবং কুসঙ্গ ত্যাগ করা তমোগুণ কাটাতে সাহায্য করে। অলসতা ঝেড়ে ফেলে অনুপ্রেরণামূলক কিছু পড়া বা সামান্য শরীরচর্চাও সত্ত্বগুণের শিখা পুনরায় জ্বালিয়ে তুলতে পারে।
৪. তিন গুণের পারস্পরিক ক্রিয়া ও ভারসাম্য
এই তিন গুণ একে অপরের শত্রু নয়, বরং তারা সহাবস্থান করে আমাদের অস্তিত্ব গঠন করে। সত্ত্ব আমাদের উন্নতি ঘটায়, রজ আমাদের চালনা করে এবং তম আমাদের বিশ্রাম বা স্থিতি দেয়। যেকোনো একটি গুণের চরম আধিক্য আমাদের ভারসাম্য নষ্ট করে। শ্রীকৃষ্ণ আমাদের শিখিয়েছেন এই শক্তিগুলিকে কেবল পর্যবেক্ষণ করতে। পদ্মফুল যেমন কাদা থেকে জন্ম নিলেও জলের ওপরে ভেসে থাকে, আমাদেরও সচেতনতার মাধ্যমে এই তিন গুণের প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠতে হবে।
৫. গুণাতীত হওয়ার পথ: পরম মুক্তি
অর্জুনকে শ্রীকৃষ্ণ জানিয়েছেন, যিনি কর্মের মধ্যে অকর্ম এবং অকর্মের মধ্যে কর্ম দেখতে পান, তিনিই প্রকৃত জ্ঞানী। যখন আমরা অহংকার ও প্রত্যাশা ত্যাগ করে কর্ম করি, তখন আমরা ত্রিগুণের মায়া অতিক্রম করি। ভক্তি, প্রার্থনা এবং নিঃস্বার্থ সেবা (সেবাধর্ম) আমাদের মনকে রজ ও তম থেকে মুক্ত করে সত্ত্বগুণে প্রতিষ্ঠিত করে। তবে চূড়ান্ত মুক্তি বা মোক্ষ লাভ করতে হলে সত্ত্বগুণকেও অতিক্রম করে পরমাত্মায় আত্মসমর্পণ করতে হয়।
Bhagavad Gita : পথ হারানো পথিকের ঠিকানা: গীতার আলোকে আত্ম-অনুসন্ধান
উপসংহার
আমরা প্রত্যেকেই আলো, আগুন এবং ছায়ার এক অদ্ভুত মিশ্রণ। কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন, আমরা এই গুণগুলি নই; আমরা হলাম সেই সচেতন আত্মা যা এই গুণগুলির পেছনে অবস্থান করে। যখন সত্ত্ব আমাদের হৃদয়ে পথ দেখায়, রজ আমাদের ইচ্ছাশক্তিকে জ্বালানি দেয় এবং তম পরিমিত বিশ্রামের কারণ হয়, তখনই জীবন এক প্রার্থনায় পরিণত হয়।


















