overthinking and gita

ব্যুরো নিউজ, ১৮ই মার্চ ২০২৬ : আমাদের মনের গহীন কোণে যখন চিন্তারা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে, তখন ‘অতিচিন্তা’ বা Overthinking হয়ে ওঠে আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু। এটি নিঃশব্দে আমাদের ভেতর প্রবেশ করে ছোট ছোট দুশ্চিন্তাকে বিশাল উদ্বেগে পরিণত করে; কেড়ে নেয় আমাদের শান্তি, স্বচ্ছতা এবং রাতের ঘুম। এর সাথে যোগ হয় নিজেদের ও ভবিষ্যৎ নিয়ে একরাশ নেতিবাচক ভাবনা, যা আমাদের বিচারবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে ফেলে।

কিন্তু এই সমস্যা আধুনিক যুগের নয়। হাজার বছর আগে কুরুক্ষেত্রের রণক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে বীর অর্জুনও ঠিক একইভাবে স্থবির হয়ে পড়েছিলেন—ভয়, সন্দেহ আর চিন্তার আবর্তে তিনি ছিলেন দিশেহারা। সেই মুহূর্তে শ্রীকৃষ্ণ তাকে কোনো অস্ত্র বা রণকৌশল দেননি, বরং দিয়েছিলেন ‘প্রজ্ঞা’। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা কেবল একটি ধর্মগ্রন্থ নয়, এটি মনকে নিয়ন্ত্রণ করার একটি পূর্ণাঙ্গ মনস্তাত্ত্বিক গাইড।

নিচে আলোচনা করা হলো কীভাবে গীতার শিক্ষা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অতিচিন্তা ও নেতিবাচকতা দূর করতে সাহায্য করে:

১. মনের চঞ্চলতাকে মেনে নেওয়া

গীতার ষষ্ঠ অধ্যায়ের ৩৪ নম্বর শ্লোকে অর্জুন স্বীকার করেছেন:

“চঞ্চলং হি মনঃ কৃষ্ণ প্রমাথি বলবদ্দৃঢম্…” (হে কৃষ্ণ, এই মন অত্যন্ত চঞ্চল, অশান্ত, শক্তিশালী ও জেদি। একে নিয়ন্ত্রণ করা বায়ুকে নিয়ন্ত্রণ করার মতোই কঠিন।)

শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের এই সংগ্রামকে অস্বীকার করেননি। তিনি বুঝিয়েছিলেন যে মনকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। ‘অভ্যাস’ (Practice) এবং ‘বৈরাগ্য’ (Detachment)-এর মাধ্যমে এই অবাধ্য মনকেও প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব।

  • শিক্ষা: অতিচিন্তার জন্য নিজের ওপর কঠোর হবেন না। মনে রাখবেন, মন একটি পেশির মতো—সঠিক অনুশীলনে এটি শক্তিশালী হয়।

২. অনাসক্তি—ফলাফল নয়, কর্মে মনোযোগ

গীতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষা হলো ফলের আশা ত্যাগ করে কর্ম করা। আমরা তখনই অতিচিন্তা করি যখন আমরা ফলাফলের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে চাই— “যদি আমি ব্যর্থ হই?”, “সবাই কী ভাববে?”। শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন (অধ্যায় ২.৪৭):

“কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন…” (তোমার অধিকার কেবল কর্মে, ফলে নয়।)

  • শিক্ষা: নিজের সেরাটা দিন, কিন্তু ভবিষ্যতের কাল্পনিক ফলাফলের পেছনে ছুটে বর্তমানকে বিষিয়ে তুলবেন না। ফলাফলের দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পেলেই মন শান্ত হবে।

Bhagavad Gita : অর্জুনের বিষাদ ও আমাদের জীবন: চাওয়া এবং পাওয়ার মাঝখানের ধূসর পথ

৩. বর্তমান মুহূর্তে স্থির হওয়া (কর্মযোগ)

অতিচিন্তা ডালপালা মেলে যখন আমরা আলস্যে থাকি অথবা অতীত-ভবিষ্যৎ নিয়ে পড়ে থাকি। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে ‘কর্মযোগ’ পালনের পরামর্শ দিয়েছেন। এর অর্থ হলো প্রতিটি কাজ পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে করা।

  • শিক্ষা: আপনি যখন একটি কাজ করেন, তখন আপনার সমস্ত চেতনা সেখানে নিবদ্ধ করুন। এই একমুখী মনোযোগই হলো এক ধরণের ধ্যান, যা অতিচিন্তার শিকল ভেঙে দেয়।

৪. দ্বৈত অনুভূতির ঊর্ধ্বে ওঠা

নেতিবাচক চিন্তা আসে আমাদের মনের ‘লেবেলিং’ করার অভ্যাস থেকে— “এটি ভালো, সেটি খারাপ”, “আমি ব্যর্থ”। শ্রীকৃষ্ণ আমাদের এই দ্বৈততা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন জয়-পরাজয়, লাভ-ক্ষতি বা সুখ-দুঃখকে সমান জ্ঞান করতে।

  • শিক্ষা: আপনার চিন্তাগুলোকে নিরপেক্ষভাবে পর্যবেক্ষণ করতে শিখুন। কোনো নেতিবাচক চিন্তা এলে নিজেকে প্রশ্ন করুন— “এটি কি সত্যিই ধ্রুব সত্য?”। চিন্তার সাথে একীভূত না হয়ে সেটিকে শুধু আসুক আর যেতে দিন।

৫. ধ্যান: মনের ‘রিসেট’ বাটন

ষষ্ঠ অধ্যায়ের ৫ নম্বর শ্লোকে বলা হয়েছে— “মনই মানুষের বন্ধু, আবার মনই মানুষের শত্রু”। মনকে বন্ধু বানানোর শ্রেষ্ঠ উপায় হলো ধ্যান বা ধ্যানযোগ

  • শিক্ষা: প্রতিদিন অন্তত ১০ মিনিট শ্বাস-প্রশ্বাসের ওপর মনোযোগ দিয়ে ধ্যান করুন। এটি আপনার এবং আপনার চিন্তার মধ্যে একটি ব্যবধান তৈরি করবে। এই ফাঁকটুকু আপনাকে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখানোর বদলে ধীরস্থিরভাবে সিদ্ধান্ত নিতে শেখাবে।

Bhagavad Gita : হৃদয় বনাম ধর্ম: যখন কর্তব্য ও আবেগ মুখোমুখি দাঁড়ায়

যুদ্ধের ময়দান এখন মনের ভেতরে

শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরিয়ে নিয়ে যাননি, বরং মনের সাথে অর্জুনের যে সম্পর্ক, তা বদলে দিয়েছিলেন। এটাই আসল শিক্ষা। আপনার মন আপনার শত্রু নয়, এটি একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। একে সচেতনতা এবং ধৈর্যের সাথে ব্যবহার করতে শিখতে হবে।

পরের বার যখন আপনার চিন্তাগুলো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে, মনে রাখবেন—আপনি একা নন। অর্জুনের মতো মহান বীরও এই সংকটের সম্মুখীন হয়েছিলেন। আপনার ভেতরেই সেই স্থিরতা লুকিয়ে আছে যার কথা শ্রীকৃষ্ণ বলে গেছেন। অতিচিন্তার ওপারে রয়েছে এক পরম শান্তির রাজ্য।

Article Bottom Widget

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিশ্ব জুড়ে

গুরুত্বপূর্ণ খবর

বিশ্ব জুড়ে

গুরুত্বপূর্ণ খবর