ব্যুরো নিউজ, ২৮শে নভেম্বর ২০২৫ : বারাসত সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্তের পর এক মৃত যুবকের চোখ উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে চরম চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। মৃত যুবকের পরিবার এই ঘটনাকে অঙ্গ পাচারের চক্রান্ত বলে অভিযোগ তুলে মঙ্গলবার ক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং প্রতিবাদ চলাকালীন তারা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কনভয় আটকে দেয়। বনগাঁর সভা থেকে ফেরার পথে যশোর রোডে এই ঘটনা ঘটে।
মুখ্যমন্ত্রীর কনভয় আটকে বিক্ষোভ, আর্থিক সাহায্যের আশ্বাস
বারাসতের কাজিপাড়ার বাসিন্দা ৩৪ বছর বয়সী প্রীতম ঘোষ সোমবার ভোরে পথ দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন এবং বারাসত মেডিকেল কলেজে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। মঙ্গলবার ময়নাতদন্তের পর তাঁর দেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার সময় প্রীতমের পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেন যে, হাসপাতালে আনার সময় তাঁর চোখ অক্ষত থাকলেও, দেহ হস্তান্তরের সময় বাঁ চোখ উধাও ছিল।
পরিবারের অভিযোগ
হাসপাতালের ভেতরে প্রীতমের চোখ “চুরি” করা হয়েছে।
এই অভিযোগ নিয়ে পরিবার বারাসত বনমালিপুর হাসপাতালের বাইরে সকাল থেকে বিক্ষোভ শুরু করে। পরে বিক্ষোভকারীরা যশোর রোডে মুখ্যমন্ত্রীর কনভয় আটকে দেয়। মুখ্যমন্ত্রী প্রায় ১৫ মিনিট ধরে ক্ষুব্ধ পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি দোষী প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন এবং পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দ্রুত সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। একইসঙ্গে, মুখ্যমন্ত্রী প্রীতমের মাকে তাৎক্ষণিক আর্থিক সাহায্য এবং তাঁর নিজস্ব কোটা থেকে একটি সরকারি চাকরি দেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দেন। প্রীতম ঘোষ এক বছর আগে বিবাহ করেছিলেন এবং তাঁর ১২ দিনের একটি শিশু রয়েছে।
ইঁদুরের তত্ত্ব এবং মর্গের ফ্রিজিং সিস্টেমের গাফিলতি
মৃত যুবকের চোখ উধাও হওয়ার বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রথমে দায় এড়াতে গিয়ে ‘ইঁদুরে চোখ উপড়ে নেওয়ার তত্ত্ব’ খাড়া করলে পরিবারের ক্ষোভ আরও বাড়ে।
মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশের পরই মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, মর্গের ফ্রিজিং সিস্টেম দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে অকেজো। মৃতদেহ সংরক্ষণের জন্য দীর্ঘকাল ধরে নিয়ম মানা হয়নি। জানা গিয়েছে, প্রীতমের পরিবারকে নিজেদের খরচেই মৃতদেহ সংরক্ষণের জন্য বরফ কিনে দিতে হয়েছিল।
হাসপাতালের প্রিন্সিপাল ও এমএসভিপি কেন মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের আগে পরিবারের সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজন মনে করলেন না, তা নিয়েও মৃতের আত্মীয়-স্বজনেরা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, মৌখিক অভিযোগ জানানো হলে তাঁরা লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত কমিটি গড়ার কথা বলেছিলেন, কিন্তু তার আগেই বিক্ষোভ শুরু হয়ে যায়।
বিরোধী দলের মন্তব্য: শুভেন্দু অধিকারীর ইঙ্গিত ‘অঙ্গ পাচার চক্রের ‘
এই ঘটনা নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এই ঘটনাটিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মন্তব্য করে সরাসরি অঙ্গ পাচার চক্রের দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
হাসপাতালের ‘ইঁদুরের তত্ত্ব’ নিয়ে কটাক্ষ করে তিনি মন্তব্য করেন:
“তাহলে, ইঁদুরটা তৃণমূলে নাম লিখিয়েছিল, কারণ তৃণমূল মানেই চোর।”
বিজেপি নেতার বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ
অন্যদিকে, এই ঘটনার প্রতিবাদে বারাসত সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে বিজেপি নেতা ও অভিনেতা রুদ্রনীল ঘোষের পরিদর্শনের পরেই তাঁর বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের হয়েছে।
অভিযোগ: হাসপাতালের অতিরিক্ত সুপার ডা. সুব্রত মণ্ডল রুদ্রনীল ঘোষের বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা দেওয়া, বিনা অনুমতিতে প্রবেশ এবং হুমকি দেওয়ার লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
মামলা: বারাসত জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (জোনাল) আতিশ বিশ্বাস জানিয়েছেন, সুপারের অভিযোগের ভিত্তিতে রুদ্রনীল ঘোষের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করা হয়েছে।
রুদ্রনীলের বক্তব্য: রুদ্রনীল ঘোষ সমস্ত অভিযোগ “মনগড়া” ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, তিনি হাসপাতালের সুপারের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে কথা বলেছেন, এমনকি ছবিও তুলেছেন। তিনি সেখানে একজন পিজিটি ডাক্তারের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ এবং রোগী পরিষেবার সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়েছিলেন।
পাল্টা অভিযোগ: তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, তাঁর পরিদর্শনের খবর ছড়িয়ে পড়তেই অভিযোগকারী অতিরিক্ত সুপারকে কালিম্পংয়ে বদলি করে দেওয়া হয়। বদলি আটকাতে ও তৃণমূল কংগ্রেসের চাপে তিনি এই মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করেছেন।
তবে, জেলা তৃণমূল কংগ্রেসের এক বরিষ্ঠ নেতা রুদ্রনীল ঘোষের এই দাবিকে “সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন” বলে নাকচ করেছেন।



















