aranyanvi

ব্যুরো নিউজ, ১৬ই জানুয়ারী ২০২৬ : হিন্দুধর্মের সুবিশাল দেবকূলে এমন কিছু দেব-দেবী আছেন যাঁরা জাঁকজমকপূর্ণ মন্দির বা বড় উৎসবের আড়ালে না থেকে নিভৃতে প্রকৃতির কোণে বাস করেন। ঋগ্বেদের অন্যতম এক বিস্মৃত অথচ গভীর তাৎপর্যপূর্ণ দেবী হলেন অরণ্যানী। তিনি কেবল বনের রক্ষাকর্ত্রী নন, বরং তিনি স্বয়ং অরণ্যের জীবন্ত স্বরূপ।

১. অরণ্যের জীবন্ত বিগ্রহ

‘অরণ্য’ শব্দ থেকে অরণ্যানী নামের উৎপত্তি। তিনি বনের গাছপালা, লতাগুল্ম এবং পশু-পাখির প্রাণশক্তির আধার। বৈদিক দর্শনে অরণ্যানী কোনো কৃত্রিম মূর্তিতে সীমাবদ্ধ নন, বরং অরণ্যের প্রতিটি স্পন্দনে তাঁর উপস্থিতি অনুভূত হয়। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন যে প্রকৃতি কেবল একটি সম্পদ নয়, বরং এক পবিত্র সত্তা যা শ্রদ্ধার দাবি রাখে।

Maa Shakti : শক্তির আরাধনা: ভক্তি ও ভীতির এক অপূর্ব সহাবস্থান

২. রহস্যময়ী ও অন্তরালবর্তিনী দেবী

অরণ্যানী দেবী অত্যন্ত রহস্যময়ী। তিনি মানুষের চোখের সামনে সহজে ধরা দেন না। বৈদিক স্তোত্র অনুযায়ী, বনের নিস্তব্ধতার মাঝে যখন বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ বা নুপুরের নিক্কন শোনা যায়, তখন মনে করা হয় দেবী তাঁর আপন ছন্দে বনের গহীনে নৃত্য করছেন। এই অদৃশ্য উপস্থিতি প্রকৃতির সেই সূক্ষ্ম শক্তির প্রতীক, যা আমরা সরাসরি দেখতে না পেলেও প্রতি মুহূর্তে অনুভব করি।

৩. প্রাণের ধাত্রী ও রক্ষাকর্ত্রী

অরণ্যানী বনের সকল জীবের অন্নদাত্রী এবং রক্ষক। তিনি কোনো লাঙল বা চাষবাস ছাড়াই অরণ্যের পশুপাখি এবং বনের ওপর নির্ভরশীল মানুষদের খাদ্যের সংস্থান করেন। গ্রামবাংলার অনেক লোকজ বিশ্বাসে আজও বনের গভীরে দেবীর উদ্দেশ্যে সামান্য ভোগ অর্পণ করার প্রথা রয়েছে। এই বিশ্বাসটি আসলে মানুষ ও প্রকৃতির পারস্পরিক নির্ভরতার এক আধ্যাত্মিক রূপ।

৪. ঋগ্বেদে অরণ্যানীর বন্দনা

হিন্দুধর্মের প্রাচীনতম ধর্মগ্রন্থ ঋগ্বেদে (১০ম মণ্ডল, ১৪৬তম সূক্ত) দেবী অরণ্যানীর বিশদ বর্ণনা পাওয়া যায়। সেখানে তাঁকে সুন্দরি, প্রাচুর্যে ভরা এবং মায়াময়ী হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। ঋগ্বেদের ঋষিরা তাঁকে এমন এক দেবী হিসেবে স্তুতি করেছেন যিনি হিংস্র পশুর ভয় দূর করেন এবং বনের শান্ত স্নিগ্ধতা বজায় রাখেন। প্রাচীন কাল থেকেই যে মানুষ অরণ্যকে পবিত্র জ্ঞান করত, এই স্তোত্রগুলি তারই প্রমাণ।

৫. আধুনিক পরিবেশ চেতনা ও অরণ্যানী

বর্তমানে যখন আমরা জলবায়ু পরিবর্তন এবং অরণ্য বিনাশের সঙ্কটে ভুগছি, তখন অরণ্যানীর আদর্শ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি আমাদের শেখান যে অরণ্যের নিজস্ব প্রাণ আছে এবং তাকে রক্ষা করা আমাদের পরম ধর্ম। অরণ্যানীর প্রতি ভক্তি আসলে পরিবেশ সংরক্ষণেরই এক আধ্যাত্মিক প্রকাশ।

Maa Shakti : মাতৃশক্তি ও স্কন্দমাতার যোগসূত্র: সপ্ত মাতৃকা উপাসনার আধ্যাত্মিক তাৎপর্য

উপসংহার: অরণ্যানীর চিরন্তন নৃত্য

অরণ্যানী হয়তো আধুনিক শহরের কোলাহলে নেই, কিন্তু প্রতিটি পাতার মড়মড় শব্দে, পাখির কলতানে আর বাতাসের ফিসফিসানিতে তিনি আজও বর্তমান। তিনি সভ্যতার ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া এক পবিত্র সুর, যিনি আমাদের বারবার প্রকৃতির কোলে ফিরে যাওয়ার ডাক দেন। তাঁর এই নিভৃত সাধনাই আমাদের শেখায় যে জীবন ও প্রকৃতির মধ্যে এক সূক্ষ্ম ও চিরন্তন ভারসাম্য বজায় রাখা কতটা জরুরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিশ্ব জুড়ে

গুরুত্বপূর্ণ খবর

বিশ্ব জুড়ে

গুরুত্বপূর্ণ খবর