jwalamukhi hp

ব্যুরো নিউজ, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ : আজকাল আমরা যখন কোনো তীর্থস্থানে যাই, আমাদের চোখে পড়ে বিশাল মন্দির, কারুকার্য করা পাথরের দেওয়াল আর সুউচ্চ শিখর। কিন্তু হিন্দু আধ্যাত্মিকতার মূলে গেলে দেখা যায়, মন্দির স্থাপত্যের বহু শতাব্দী আগে ভক্তি মিশে ছিল বন-পাহাড়, নদী, গুহা আর অগ্নির সাথে। শক্তিপীঠগুলো হলো সেই আদিম বিশ্বাসের প্রাণকেন্দ্র। সতীদেহের খণ্ডাংশ যেখানে পতিত হয়েছিল, সেই মাটিই হয়ে উঠেছিল পবিত্র। কোনো ছাদ বা দেওয়ালের ঘেরাটোপ ছাড়াই একসময় মানুষ সরাসরি প্রকৃতির মধ্যে অনুভব করত সেই দৈব তেজকে।

১. কামাখ্যা: যেখানে ধরিত্রীই স্বয়ং ঈশ্বর

আসামের কামাখ্যা মন্দির দেবী উপাসনার অন্যতম প্রাচীন নিদর্শন। এখানে কোনো পাথরের মূর্তি নেই; বরং একটি প্রাকৃতিক গুহার মধ্যে পাথরের খাঁজ থেকে নির্গত জলধারাকেই দেবী হিসেবে পূজা করা হয়। এটি ঋতুস্রাব, উর্বরতা এবং জীবনচক্রের এক অমোঘ প্রতীক। আধুনিক ধর্ম অনেক সময় যা এড়িয়ে চলে, প্রাচীন আধ্যাত্মিকতা সেই ‘রজঃস্বলা’ রূপকেই শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা দিয়েছে। অম্বুবাচী উৎসব আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এই বিশ্বাস মন্দির প্রথার চেয়েও অনেক বেশি প্রাচীন এবং প্রকৃতির কাছাকাছি।

Maa Kali : তন্ত্রের রূপকল্প ও মিথিলা শিল্প: দশমহাবিদ্যার আধ্যাত্মিক বিবর্তন

২. কালীঘাট: কলকাতার পত্তনের বহু আগের এক শক্তি

আজকের তিলোত্তমা কলকাতা গড়ে ওঠার বহু আগে থেকেই কালীঘাট ছিল এক জাগ্রত আদিম ক্ষেত্র। ভাগীরথীর আদি গঙ্গার তীরে, শ্মশান সংলগ্ন এক তান্ত্রিক পরিমণ্ডলে এই দেবীর আরাধনা চলত। আজকের যে মন্দির কাঠামো আমরা দেখি, তা হয়তো কয়েকশ বছরের পুরনো, কিন্তু কালীর আদি রূপ কোনো সমাজ বা শাস্ত্রের নিয়মে বাঁধা ছিল না। তিনি ছিলেন মায়া ও অহংকার বিনাশকারী এক প্রলয়ঙ্করী শক্তি।

৩. জ্বালামুখী: শিখাহীন অনন্ত আগুন

হিমাচল প্রদেশের জ্বালামুখীতে কোনো বিগ্রহ নেই। এখানে শিলাস্তরের ফাঁক দিয়ে প্রাকৃতিক গ্যাস নির্গত হয়ে যে শিখা জ্বলে, তাকেই দেবী হিসেবে মানা হয়। অগ্নি উপাসনা মানব সভ্যতার আদিতম প্রবৃত্তিগুলোর একটি। জ্বালামুখী মন্দির সেই আদিম প্রবৃত্তিকে আজও বাঁচিয়ে রেখেছে। শাস্ত্র বা স্থাপত্য নয়, বরং পঞ্চভূতের অন্যতম ‘অগ্নি’ এখানে সরাসরি পূজিত হন।

৪. হিংলাজ মাতা: দুর্গম গুহায় আদিম সত্তা

বেলুচিস্তানের মরু প্রান্তরে অবস্থিত হিংলাজ মাতা মন্দির ত্যাগের এক চরম নিদর্শন। কোনো রাজকীয় মন্দির নয়, পাহাড়ের এক প্রাকৃতিক গুহাই এখানে দেবীর আলয়। কোনো সম্রাট বা সাম্রাজ্য এই স্থানকে তৈরি করেনি; যাযাবর, বণিক আর সাধুরা বহু শতাব্দী ধরে নিজেদের অন্তর্নিহিত টানে এখানে পৌঁছে যেতেন। এটি প্রমাণ করে যে ভক্তি আসলে আরামের নয়, বরং সহনশীলতা ও কঠিন সংকল্পের নাম।

৫. বিশালাক্ষী ও শারদা পীঠ: জ্ঞান ও সুরক্ষার উৎস

বারাণসীকে আজ আমরা শিবের শহর হিসেবে জানলেও, লোককথা বলে এর আধ্যাত্মিক ভিত তৈরি হয়েছিল বিশালাক্ষী দেবীর হাত ধরে। প্রাচীন শহরগুলো যে দেবী কেন্দ্রিক ছিল, তার বড় প্রমাণ এই পীঠ। অন্যদিকে, শারদা পীঠ একসময় কেবল একটি মন্দির ছিল না, এটি ছিল জ্ঞান ও তর্কের মহাপীঠ। এমনকি ‘শারদা লিপি’র জন্মও হয়েছিল এই পুণ্যভূমি থেকে। এখানে শক্তি মানে কেবল তেজ নয়, শক্তি মানেই হলো প্রজ্ঞা ও শিক্ষা।

Maa Ganga : পবিত্র গঙ্গা: ক্ষমা, ধৈর্য ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক চিরন্তন প্রবাহ

উপসংহার: বিশ্বাস যখন স্থাপত্যের ঊর্ধ্বে

শক্তিপীঠগুলো আমাদের শেখায় যে ধর্ম বা আধ্যাত্মিকতা মানে কেবল কারুকার্য করা পাথর নয়। স্থাপত্য ভক্তির পরে এসেছে, ভক্তি স্থাপত্যের পরে নয়। পাহাড়ের গুহায় বা প্রবহমান নদীতে যখন মানুষ নতজানু হয়েছে, তখনই জন্ম নিয়েছে এক একটি শক্তিপীঠ। এগুলি কেবল দর্শনীয় স্থান নয়, বরং প্রকৃতির সাথে মানুষের সেই আদিম সম্পর্কের যোগসূত্র যা আজও অমলিন।

Article Bottom Widget

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিশ্ব জুড়ে

গুরুত্বপূর্ণ খবর

বিশ্ব জুড়ে

গুরুত্বপূর্ণ খবর