ব্যুরো নিউজ, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ : ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ১২৫ বছরের মর্ত্যলীলা কেবল একটি জীবনকাহিনী নয়, বরং প্রেম, কর্তব্য, রাজনীতি এবং বৈরাগ্যের এক মহাকাব্যিক সংমিশ্রণ। মহাভারত ও পুরাণ অনুসারে, শ্রীকৃষ্ণ কোনো নির্দিষ্ট স্থানে দীর্ঘকাল আবদ্ধ থাকেননি। জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে যখনই তাঁর লক্ষ্য পূরণ হয়েছে, তখনই তিনি সেই স্থান ত্যাগ করে নতুন কর্তব্যের পথে এগিয়ে গেছেন। তাঁর পদধূলি ধন্য নয়টি প্রধান স্থান আজও ভক্ত হৃদয়ে তাঁর অস্তিত্বের জানান দেয়।
মথুরা: জন্ম ও সংগ্রামের সূচনা
কংসের কারাগারে পাশবিক অত্যাচারের মধ্যে শ্রীকৃষ্ণের জন্ম। মথুরা তাঁর জীবনের সেই প্রাথমিক পর্যায়কে চিহ্নিত করে, যেখানে প্রতিকূলতার মধ্যেও সত্যের জয় অনিবার্য। মথুরাবাসীদের কাছে তিনি আজও সেই রক্ষাকর্তা, যিনি রাজনৈতিক ত্রাসের অবসান ঘটিয়েছিলেন।
গোকুল: শৈশবের সুরক্ষা (০-৩ বছর)
কংসের হাত থেকে বাঁচতে শিশু কৃষ্ণের শৈশব কেটেছে গোকুলে। নিজের রাজকীয় পরিচয় থেকে দূরে সাধারণ গোপবালক হিসেবে বেড়ে ওঠা শ্রীকৃষ্ণের এই পর্যায়টি ছিল মানবিক সম্পর্ক ও পারস্পরিক মমতার। গোকুল আজও তাঁর ননীচুরির মধুর স্মৃতিতে বিভোর।
Lord Krishna : গোবর্ধন পর্বতের প্রেম কাহিনী থেকে জন্ম নেওয়া ছাপ্পান্ন ভোগের রহস্য !
বৃন্দাবন: প্রেম ও বিচ্ছেদের লীলাভূমি (৩-১১ বছর)
শ্রীকৃষ্ণের জীবনের দীর্ঘতম এবং আবেগময় সময় কেটেছে বৃন্দাবনে। প্রকৃতি, পশু-পাখি এবং গোপিনীদের সাথে তাঁর গভীর আত্মিক সম্পর্ক এখানেই গড়ে ওঠে। বৃন্দাবন ত্যাগের পর যে চিরস্থায়ী বিচ্ছেদ তৈরি হয়েছিল, তা আজও ভক্তদের কাছে বিরহের এক আধ্যাত্মিক সাধনা।
মথুরায় প্রত্যাবর্তন: কংস বধ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা (১১-১২ বছর)
কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পদার্পণ করতেই কৃষ্ণ মথুরায় ফেরেন কংসের অত্যাচার শেষ করতে। এই সংক্ষিপ্ত অবস্থানটি ছিল আবেগপ্রবণ জীবন থেকে রাজনৈতিক দায়িত্বের দিকে উত্তরণের প্রতীক।
দ্বারকা: রাজধর্ম ও স্থিতিশীলতা (১২-৯০ বছর)
শ্রীকৃষ্ণের দীর্ঘতম আবাসন ছিল দ্বারকায়। এখানে তিনি কোনো বিলাসপ্রিয় রাজা নন, বরং একজন কুশলী রণনীতিবিদ এবং প্রজাবৎসল শাসক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। যাদব বংশের বিনাশকালেও তিনি স্থিতপ্রজ্ঞ থেকে তাঁর নির্মোহ সত্তার পরিচয় দিয়েছিলেন।
কুরুক্ষেত্র: কর্ম ও দর্শনের পীঠস্থান (প্রায় ৯০ বছর বয়সে)
কুরুক্ষেত্র কৃষ্ণের প্রজ্ঞার প্রতীক। যুদ্ধ না করেও তিনি ছিলেন যুদ্ধের নিয়ন্ত্রক। এখানেই জন্ম নিয়েছিল ‘শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা’, যা আজও মানবজাতিকে কর্ম ও অনাসক্তির শিক্ষা দেয়।
হস্তিনাপুর: শান্তি ও কূটনীতির কেন্দ্র
হস্তিনাপুরে শ্রীকৃষ্ণকে দেখা যায় একজন মহান শান্তিদূত হিসেবে। যুদ্ধ এড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা এবং ন্যায়ের পক্ষে তাঁর অটল অবস্থান হস্তিনাপুরকে তাঁর মানবিক ও দিব্য হস্তক্ষেপের সাক্ষী করে রেখেছে।
Lord Krishna ; ধর্মের দিগ্বিজয়ী রূপ, কেন শ্রীকৃষ্ণ মুরারি ? জেনে নিন সেই ইতিহাস
প্রভাস পাটন: বৈরাগ্য ও মহাপ্রয়াণ (অন্তিম সময়)
ক্ষমতা এবং জনকোলাহল থেকে দূরে প্রভাস পাটন কৃষ্ণের ইহলৌকিক যাত্রার সমাপ্তি ঘটায়। কোনো প্রতিবাদ ছাড়াই নির্জনে তিনি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেন, যা পরম বৈরাগ্যের পরিচয় বহন করে।
জগন্নাথ পুরী: স্মৃতি থেকে অস্তিত্বে রূপান্তর
ঐতিহ্য অনুসারে, কৃষ্ণের নশ্বর দেহ লীন হলেও তাঁর হৃদয় আজও স্পন্দিত হয় পুরীর জগন্নাথ বিগ্রহে। পুরী আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, কৃষ্ণ কোনো অতীত ইতিহাস নন, তিনি বর্তমানের এক জীবন্ত অস্তিত্ব।



















