ব্যুরো নিউজ, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ : হিন্দুধর্মে ভগবান হনুমান এক অনন্য মহিমায় ভাস্বর। তিনি কেবল অপরিসীম শক্তি বা সাহসের প্রতীক নন, বরং নিস্বার্থ সেবা ও অবিচল ভক্তির এক জীবন্ত উদাহরণ। অন্যান্য দেবতারা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে পৃথিবীতে অবতার গ্রহণ করেন এবং কাজ শেষে স্বধামে ফিরে যান, কিন্তু হনুমানজি হলেন ‘চিরঞ্জীবী’। কলিযুগের শেষ পর্যন্ত তিনি এই পৃথিবীতেই অবস্থান করবেন—এই বিশ্বাস কোটি কোটি ভক্তের মনে আশার আলো জ্বালায়।
শৈশবে দেবতাদের আশীর্বাদ ও অপরাজেয় শক্তি
হনুমানজির অমরত্বের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল তাঁর শৈশবেই। কথিত আছে, শিশুকালে তিনি সূর্যকে ফল মনে করে গিলে ফেলার চেষ্টা করেছিলেন। এতে দেবরাজ ইন্দ্র ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁর ওপর বজ্র নিক্ষেপ করলে বায়ুদেব (হনুমানের পিতা) অত্যন্ত ব্যথিত হন এবং মহাবিশ্বের বায়ুপ্রবাহ স্তব্ধ করে দেন। তখন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে রক্ষা করতে ব্রহ্মা ও অন্যান্য দেবতারা হনুমানকে বিশেষ বর প্রদান করেন। তিনি সমস্ত অস্ত্রের আঘাত থেকে মুক্তি, অজেয় শক্তি এবং ‘স্বেচ্ছামৃত্যু’র বর লাভ করেন। এই আশীর্বাদগুলিই তাঁকে ধর্মের রক্ষক হিসেবে অপ্রতিরোধ্য করে তোলে।
Hanumanji : ভক্তি যেখানে অমর: কেন ভগবান বিষ্ণুর শেষ অবতারেরও সাক্ষী পবনপুত্র?
দেবী সীতার বরদান ও অমরত্ব
লঙ্কার যুদ্ধে জয়লাভ এবং রাবণ বধের পর, ভগবান রামের প্রতি হনুমানের একনিষ্ঠ সেবায় মুগ্ধ হয়ে মাতা সীতা তাঁকে পরম আশীর্বাদ ধন্য করেন। সীতা তাঁকে ‘চিরঞ্জীবী’ হওয়ার বর দেন, যার ফলে তিনি জরা-মৃত্যুর ঊর্ধ্বে থেকে চিরকাল তরুণ ও শক্তিশালী থাকবেন। এই আশীর্বাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল যাতে পৃথিবীর যেখানেই রাম-নাম জপ হবে বা রামায়ণ পাঠ করা হবে, সেখানেই হনুমান উপস্থিত থেকে ভক্তদের রক্ষা করতে পারেন।
শ্রীরামের আদেশ ও কলিযুগে হনুমানের ভূমিকা
মর্ত্যলোক ত্যাগের আগে ভগবান শ্রীরাম হনুমানকে এক বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে যান। তিনি নির্দেশ দেন যে, কলিযুগের অন্ধকার সময়ে অধর্ম যখন মাথাচাড়া দেবে, তখন হনুমান যেন পৃথিবীতে অবস্থান করে ভক্তদের সুরক্ষা দেন এবং ধর্মকে পুনপ্রতিষ্ঠিত করেন। হনুমানজি নিজের জন্য মোক্ষ বা স্বর্গসুখ কামনা করেননি; বরং তিনি মর্ত্যলোকে থেকে শ্রীরামের নাম প্রচার ও ভক্তদের সেবা করাকেই জীবনের পরম লক্ষ্য হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
Hanumanji : কেন সরল ও অনাড়ম্বর ভক্তরাই হনুমানজির সবচেয়ে কাছের?
অন্যান্য অবতারের সাথে পার্থক্য
বিষ্ণু বা শিবের বিভিন্ন অবতার নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণের পর নিজ ধামে ফিরে যান। কিন্তু হনুমানজির উপস্থিতি স্থায়ী। তিনি ভক্ত ও ভগবানের মধ্যে এক সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করেন। বিশ্বাস করা হয়, আজও যেখানে ভক্তিভরে রামায়ণ পাঠ করা হয়, সেখানে হনুমানজি অদৃশ্যভাবে উপস্থিত থাকেন। তিনি কলিযুগের শেষে বিষ্ণুর অন্তিম অবতার ‘কল্কি’-র আগমনের প্রতীক্ষায় আছেন, যাতে পুনরায় সত্যযুগের সূচনা করা যায়।
জীবন দর্শনের শিক্ষা
হনুমানজির জীবন থেকে আমাদের শেখার আছে অনেক কিছু। তাঁর জীবন আমাদের শেখায় যে—প্রকৃত শক্তি আসে ভক্তি ও শৃঙ্খলা থেকে। নিস্বার্থ সেবা কীভাবে ব্যক্তিগত মুক্তির চেয়েও বড় হয়ে উঠতে পারে, তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ তিনি। ভয় ও অনিশ্চয়তার সময়ে তাঁর স্মরণ আমাদের মনে সাহস ও আধ্যাত্মিক শক্তি যোগায়।




















