kali mithila

ব্যুরো নিউজ, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ : মিথিলা বা মধুবনী পেন্টিংয়ের নাম শুনলে আমাদের চোখের সামনে সাধারণত ফুটে ওঠে ঘরের দেওয়ালে নারীদের আঁকা ভক্তি, স্মৃতি আর লোকাচারের ছবি। কিন্তু যখন এই নারী-শাসিত শিল্পক্ষেত্রে পুরুষরা প্রবেশ করেন, তখন জন্ম নেয় এক নতুন দ্বান্দ্বিকতা আর আধ্যাত্মিক সম্ভাবনা। কৃষ্ণানন্দ ঝা এবং সন্তোষ কুমার দাসের শিল্পকর্মে সেই বিবর্তনই ধরা পড়েছে ‘দশমহাবিদ্যা: জেসচার, ফর্ম অ্যান্ড দ্য ফেমিনাইন ডিভাইন’ প্রদর্শনীতে।

দশমহাবিদ্যা: নারীশক্তির অনন্ত রূপ

তন্ত্রের কেন্দ্রে রয়েছেন দশমহাবিদ্যা—দেবী পার্বতীর দশটি রূপ। তাঁরা একক নন, বরং বহুমাত্রিক। তাঁরা একইসাথে সৃষ্টির আনন্দ এবং বিনাশের সংহারক রূপ।

  • কালী: কাল বা সময়ের সংহারক।

  • তারা: সঙ্কট থেকে উদ্ধারকারী পথপ্রদর্শক।

  • ষোড়শী বা ত্রিপুরসুন্দরী: পরম সৌন্দর্য।

  • ভুবনেশ্বরী: বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অধিশ্বরী।

  • ভৈরবী: ভয়াল এবং তেজস্বিনী।

  • ছিন্নমস্তা: স্বীয় মস্তক ছিন্নকারিনী, যিনি আত্মত্যাগ ও প্রাণশক্তির প্রতীক।

  • ধূমাবতী: বিধবা বা শোকাতুর বৃদ্ধা।

  • বগলামুখী: শত্রুবিনাশিনী স্তম্ভনশক্তি।

  • মাতঙ্গী: ব্রাত্য বা অস্পৃশ্য রূপের দেবী।

  • কমলা: সমৃদ্ধি ও সৌভাগ্যের আধার।

তন্ত্রের এই দর্শন শেখায় যে নারীশক্তি কেবল লালনপালনকারী নয়, তা সংহারক, রহস্যময় এবং সীমাহীন।

Maa Ganga : পবিত্র গঙ্গা: ক্ষমা, ধৈর্য ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক চিরন্তন প্রবাহ

কৃষ্ণানন্দ ঝা: পৌরোহিত্যের উত্তরাধিকার ও রঙের সাধনা

মধুবনীর হরিনগরের এক তান্ত্রিক পুরোহিত পরিবারে জন্ম কৃষ্ণানন্দ ঝার। উত্তরাধিকার সূত্রে তাঁর পৌরোহিত্য করার কথা থাকলেও তিনি বেছে নেন তুলি। নারীদের জন্য সংরক্ষিত এই শিল্পমাধ্যমে তিনি ফুটিয়ে তোলেন তাঁর অন্তর্দৃষ্টি। তাঁর প্রিয় বিষয় ছিল দেবী ছিন্নমস্তা। তাঁর আঁকা ছবিগুলোতে দেবীরা স্থির নন, বরং গতিময়। দেবীর প্রতিটি মুদ্রা আর দৃষ্টি দর্শককে এক আধ্যাত্মিক শোভাযাত্রার দিকে নিয়ে যায়।

সন্তোষ কুমার দাস: জ্যামিতিক স্থিরতা ও ধ্যানস্থ শক্তি

কৃষ্ণানন্দ ঝার ছবির ঠিক বিপরীতে সন্তোষ কুমার দাসের অঙ্কনশৈলী। তাঁর আঁকা দশমহাবিদ্যা সমান্তরাল, সুশৃঙ্খল এবং ধ্যানমগ্ন। প্রতিটি প্রতিমায় রয়েছে নিখুঁত বিন্যাস এবং এক শান্ত অথচ সুপ্ত তেজ। তাঁর এই কাজগুলো যেন জীবন্ত ‘যন্ত্র’ (Yantra)। ঐতিহ্য মেনে চললেও তাঁর ছবিতে বর্তমান সময়ের পরিচয়, সহিংসতা এবং ভক্তির এক সমকালীন প্রতিফলন পাওয়া যায়।

Maa Kaali : অন্ধকার পেরিয়ে আলোর পথে: কালীপূজা ও ভেতরের শক্তি জাগরণের শিক্ষা

এক নতুন প্রেক্ষাপট: যেখানে দেবীই প্রধান

ঐতিহাসিকভাবে তন্ত্রে পুরুষের আধিপত্য থাকলেও মিথিলা শিল্পে নারীরাই ছিলেন মূল রূপকার। কৃষ্ণানন্দ বা সন্তোষ কুমার দাসের মতো শিল্পীরা যখন এই পথে হাঁটেন, তখন এক কৌতূহলোদ্দীপক সন্ধিক্ষণ তৈরি হয়। এটি কি পুরুষতান্ত্রিক অধিকারের সম্প্রসারণ নাকি নতুন কোনো রূপান্তর? মজার বিষয় হলো, বর্তমানে অনেক নারী শিল্পীও দশমহাবিদ্যা অঙ্কন করছেন, যা একসময় তাঁদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল। এই অমীমাংসিত পরিসরে নারী বা পুরুষ কেউ প্রধান নয়; এখানে একমাত্র অধীশ্বরী হলেন দেবী স্বয়ং—যিনি কেবল প্রেরণা নন, বরং সমগ্র জগতের চালিকাশক্তি।

Article Bottom Widget

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিশ্ব জুড়ে

গুরুত্বপূর্ণ খবর

বিশ্ব জুড়ে

গুরুত্বপূর্ণ খবর