ব্যুরো নিউজ, ২৩শে জানুয়ারী ২০২৬ : আধুনিক যুগের এই উচ্চকিত তর্কের ভিড়ে, তথ্যের পাহাড় আর যান্ত্রিক আস্ফালনে আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে প্রজ্ঞা বা জ্ঞান কোনো উচ্চস্বর নয়, বরং তা হলো ‘বাচ্য’—অর্থাৎ শব্দের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা সারসত্য। শ্বেতশুভ্র বসনা, পদ্মাসীন যে দেবীর হাতে আমরা বীণা দেখি, তিনি কেবল অক্ষরজ্ঞান বা পুঁথিগত বিদ্যার প্রতীক নন; তিনি আসলে সেই উপলব্ধিজাত জ্ঞানের দেবী, যা তথ্যকে প্রজ্ঞায় রূপান্তরিত করে।
শব্দ যখন নৈঃশব্দ্যের সোপান
ঋগ্বেদে সরস্বতীকে বর্ণনা করা হয়েছে সেই শক্তিরূপে, যিনি অন্তরের গহিনে সত্যের যজ্ঞ সম্পাদনকারীর হৃদয়ে জ্ঞানের ধারা বইয়ে দেন। আজকের পৃথিবীতে আমরা যখন জিপিএ (GPA), আইকিউ (IQ) আর মেধার লড়াইয়ে ব্যস্ত, তখন সরস্বতী আমাদের শেখান ‘ধ্যান’। মুখস্থ করা বা তথ্য জমা করা পাণ্ডিত্য তৈরি করতে পারে, কিন্তু ঋষি হতে গেলে প্রয়োজন রূপান্তরের। কঠোপনিষদের নচিকেতার মতো যিনি শান্ত, স্থির এবং তিতিক্ষু, জ্ঞানের আলোকবর্তিকা কেবল তাঁর সামনেই উদ্ভাসিত হয়। উচ্চকিত মন অহংকারে পূর্ণ থাকে, আর সরস্বতী রাজহংসীর মতো শান্ত হৃদয়ের মানস সরোবরেই বিহার করতে ভালোবাসেন।
Vasant Panchami : শুক্ল পঞ্চমী ও ব্রজরেণু: জ্ঞান যখন প্রেমের চরণে সমর্পিত
২০২৬-এর বিশেষত্ব: উৎসাহ নয়, প্রয়োজন শৃঙ্খলার
২০২৬ সালের ২৩ জানুয়ারি, এবারের সরস্বতী পূজা এক বিশেষ গ্রহগত বিন্যাসের সাক্ষী থাকছে। মীন রাশিতে চন্দ্র এবং মকর ও মীন রাশিতে গ্রহদের শক্তিশালী সমাবেশ আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, কেবল সাময়িক উদ্দীপনা নয়, এবারের পুজোর মূল মন্ত্র হলো শৃঙ্খলা (Discipline)। এটি ফাঁকি দেওয়ার বা শর্টকাট খোঁজার বছর নয়, বরং এটি হলো বনিয়াদ গড়ার সময়। গ্রহগত অবস্থান বলছে, এই বছর সেই সমস্ত শিক্ষার্থী বা সাধকদের জন্য বিশেষ ফলদায়ী হবে, যারা ধৈর্য এবং গভীর একাগ্রতার সাথে দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছেন।
বিবেক ও হংসবৃত্তি: সত্য-মিথ্যার বিভাজন
দেবীর বাহন হংস বা রাজহাঁস কেবল একটি পাখি নয়, এটি ‘বিবেকের’ প্রতীক। দুধ ও জলের মিশ্রণ থেকে রাজহাঁস যেমন শুধু দুধটুকুই গ্রহণ করে, আধ্যাত্মিক সাধককেও তেমনই অগাধ তথ্যের কোলাহল থেকে সত্যকে ছেঁকে নিতে হয়। আধুনিক শিক্ষার লক্ষ্য যদি হয় মুখস্থ (Memorization), তবে সনাতন দর্শনের লক্ষ্য হলো উপলব্ধি (Realization)। কেন উপনিষদ যেমন বলেছে—”যিনি মনে করেন তিনি সব জানেন, তিনি আসলে কিছুই জানেন না।” জ্ঞান যখন অহংমুক্ত হয়ে সমর্পণে পরিণত হয়, তখনই প্রকৃত সরস্বতীর আগমন ঘটে।
Ganeshji : আধ্যাত্মিক প্রজ্ঞা এবং পার্থিব সমৃদ্ধির সমন্বয়: বিঘ্নহর্তার জোড়া বিবাহ-রহস্য
সাফল্যের পাথেয়: সরস্বতী পুজোর দিন করণীয়
এবারের গ্রহগত বিন্যাস অনুযায়ী, যারা জ্ঞানার্জন বা সৃজনশীল কাজের সাথে যুক্ত, তাঁদের জন্য কিছু বিশেষ পরামর্শ:
পাঠের সাথে লেখনী: কেবল পড়ার চেয়ে লেখার ওপর জোর দিন। বুধ ও শনির প্রভাবযুক্ত এই সময়ে হাতে কলমে কাজ করা বা নোট তৈরি করা স্মৃতির গভীরে জ্ঞানকে প্রোথিত করবে।
অব্যবহৃত বস্তুর বিসর্জন: আপনার পড়ার টেবিল বা কর্মক্ষেত্র পরিষ্কার রাখুন। পৃথিবীর উপাদান (Earth Energy) প্রবল থাকায় জাগতিক পারিপার্শ্বিকতার পরিচ্ছন্নতা মানসিক স্বচ্ছতা নিয়ে আসবে।
দান ও কৃতজ্ঞতা: বিদ্যাদান মহৎ কাজ। অভাবী ছাত্রীদের শিক্ষা উপকরণ দান করুন। সেই সঙ্গে নিজের গুরু বা শিক্ষকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে ভুলবেন না।
মৌনতা ও মন্ত্র: নীল সরস্বতী মন্ত্র বা গায়ত্রী মন্ত্রের জপ করুন। গায়ত্রী মন্ত্র কোনো পার্থিব সম্পদ চায় না, এটি কেবল প্রার্থনা করে—”ধিয়ো য়ো নঃ প্রচোদয়াৎ” (আমাদের বুদ্ধিকে দীপ্ত করো)।
উপসংহার: জ্ঞানের চরম রূপ মৌন
সরস্বতী দেবী ডিগ্রি বা ডেটা দিয়ে সন্তুষ্ট হন না; তিনি শুদ্ধতা, বিনয় এবং অন্তর্মুখী সাধনায় প্রসন্ন হন। শ্রী রমণ মহর্ষি কোনো পুঁথি পড়ে জ্ঞানী হননি, তিনি হয়েছিলেন আত্ম-অনুসন্ধানের মাধ্যমে। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রয়োজন সেই অন্তরের নীরবতাকে ফিরে পাওয়া। তথ্যের সংখ্যায় নয়, বরং জ্ঞানের গভীরতায় আমাদের জীবন সমৃদ্ধ হোক। সরস্বতী পুজোর এই পুণ্য লগ্ন আমাদের শেখাক—হৃদয় যখন শান্ত হয়, তখনই দেবী কথা বলেন।




















