ব্যুরো নিউজ, ১৯শে জানুয়ারী ২০২৬ : পুরাণের পাতায় ঋষি মার্কণ্ডেয়র কাহিনী কেবল একটি অলৌকিক গল্প নয়, বরং এটি একটি বলিষ্ঠ ঘোষণা যে—নিষ্ঠা ও ভক্তি থাকলে ললাটলিখনও বদলে দেওয়া সম্ভব। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জীবন ও মৃত্যুর কঠিন নিয়মগুলিও অকৃত্রিম বিশ্বাসের সামনে মাথা নত করতে বাধ্য হয়।
নিয়তির অমোঘ বিধান ও একটি কঠিন সত্য
ঋষি মার্কণ্ডেয় অসাধারণ মেধা, পবিত্রতা ও ভক্তি নিয়ে জন্মেছিলেন। কিন্তু তাঁর জন্মের সাথেই জড়িয়ে ছিল এক চরম সত্য: মাত্র ১৬ বছর বয়সেই তাঁর মৃত্যু নির্ধারিত ছিল। গভীর তপস্যার পর তাঁর পিতামাতা যখন সন্তান লাভ করেন, তখন তাঁদের স্পষ্ট জানানো হয়েছিল যে এই পুত্রের আয়ু হবে অতি স্বল্প। সাধারণ মানুষ এমন ভাগ্যের কথা জানলে ভয়ে কুঁকড়ে যেত, কিন্তু মার্কণ্ডেয় ছিলেন আলাদা। তিনি ভয়কে তুচ্ছ করে নিজের মনকে নিবদ্ধ করলেন পরমেশ্বর শিবের চরণে।
Lord Shiva : মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র : শিবের আশীর্বাদে আরোগ্য, সুরক্ষা ও মোক্ষের মহামন্ত্র
ভয়ের ঊর্ধ্বে এক কিশোরের সাধনা
ষোড়শ বর্ষ যত ঘনিয়ে আসতে লাগল, মার্কণ্ডেয়র আরাধনা তত তীব্র হয়ে উঠল। তিনি মৃত্যুর চিন্তায় বিচলিত না হয়ে প্রতিটি মুহূর্ত অতিবাহিত করতেন ‘মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র’ জপ করে। তাঁর এই সাধনা ভীতি থেকে আসেনি, এসেছিল অগাধ প্রেম থেকে। এই প্রেমই তাঁকে এমন এক আধ্যাত্মিক শক্তিতে রূপান্তরিত করেছিল, যা মহাবিশ্বের কোনো শক্তির পক্ষেই উপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না।
যখন যমরাজ দুয়ারে উপনীত
ষোড়শ জন্মদিনের সেই নির্দিষ্ট লগ্নে খোদ মৃত্যুদেব যমরাজ এলেন তাঁর প্রাণ হরণ করতে। মার্কণ্ডেয় তখন শিবলিঙ্গকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে ধ্যানমগ্ন। যমরাজ যখন তাঁর মরণ-পাশ (ফাঁস) ছুড়লেন, তখন তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে শিবলিঙ্গের গায়ে গিয়ে পড়ল। এই ঘটনাটি আর সাধারণ কর্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ রইল না; এটি স্বয়ং মহাদেবের প্রতি এক অবমাননায় পর্যবসিত হলো।
মহাদেবের রুদ্র আবির্ভাব ও অভয়দান
মুহূর্তের মধ্যে শিবলিঙ্গ বিদীর্ণ করে প্রলয়ংকরী মূর্তিতে আবির্ভূত হলেন মহাদেব। ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে তিনি যমরাজকে নিরস্ত করলেন এবং ঘোষণা করলেন—”আমার ভক্তকে স্পর্শ করার সাধ্য কারও নেই।” এই রুদ্র রূপেই শিব প্রমাণ করলেন যে তিনি ‘মহাকাল’; তিনি সময়ের অতীত, মৃত্যুর অতীত এবং স্বয়ং নিয়তিরও ঊর্ধ্বে।
Lord Shiva : মহাদেবের শিক্ষায় মানসিক চাপ, ক্রোধ ও উদ্বেগ থেকে মুক্তি
কেন শিব রক্ষা করলেন মার্কণ্ডেয়কে?
শিব মার্কণ্ডেয়কে রক্ষা করেছিলেন কারণ তাঁর ভক্তি ছিল নিঃস্বার্থ। মার্কণ্ডেয় কখনো দীর্ঘায়ু বা প্রাণভিক্ষা চাননি; তিনি কেবল মহাদেবের চরণে আশ্রয় চেয়েছিলেন। এই পূর্ণ আত্মসমর্পণই ভগবানকে বাধ্য করেছিল মর্ত্যের নিয়ম ভাঙতে। নিছক অলৌকিকতা নয়, এই কাহিনী আমাদের শেখায় যে যখন প্রেম ও আত্মসমর্পণ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়, তখন ঈশ্বর নিজেই ভক্তের ঢাল হয়ে দাঁড়ান।
মহাজাগতিক আশীর্বাদ ও চিরঞ্জীবী মার্কণ্ডেয়
পরবর্তীতে যমরাজকে পুনর্জীবিত করে শিব মার্কণ্ডেয়কে ‘চিরঞ্জীবী’ হওয়ার বর দান করেন। মার্কণ্ডেয়র এই কাহিনী যুগ যুগ ধরে মানুষের কাছে এক ধ্রুব সত্য পৌঁছে দিচ্ছে: ভক্তি থাকলে নিয়তিকে নতুন করে লেখা যায়, কর্মফলকে অতিক্রম করা যায় এবং অটুট বিশ্বাস অসম্ভবকেও সম্ভব করতে পারে।




















