shakti aradhana despite fear

ব্যুরো নিউজ, ৯ই জানুয়ারী ২০২৬ : প্রতিটি সংস্কৃতি এবং মানুষের অন্তরাত্মায় এমন এক শক্তির অস্তিত্ব স্বীকার করা হয়েছে, যা একইসাথে জীবনকে ধারণ করে আবার প্রয়োজনে ওলটপালট করে দেয়। হিন্দু দর্শনে এই মহাজাগতিক শক্তিকেই ‘শক্তি’ বা দিব্য নারীসত্তা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে—যিনি জন্ম দেন, লালন করেন এবং প্রয়োজনে ধ্বংসের মাধ্যমে নতুন রূপান্তর ঘটান। শক্তির আরাধনা করার অর্থ হলো জীবনকেই সম্মান জানানো। আবার তাঁকে ভয় পাওয়া মানে হলো রূপান্তরের সেই কঠিন পথকে মেনে নেওয়া। এই ভক্তি ও ভয় কোনো বিরোধ নয়, বরং এটি আমাদের অস্তিত্বের এক পরম সত্য।

জীবনই শক্তি এবং জীবন অনিশ্চিত

জীবনের এই শক্তি যেমন সৃজনশীল, তেমনই তা সমস্ত আরামদায়ক নিশ্চয়তাকে ভেঙে দেয়। শক্তি মানেই সৃষ্টি—বীজের অঙ্কুরোদগম, হৃদপিণ্ডের স্পন্দন কিংবা প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস। আমরা তাঁর পূজা করি কারণ তিনিই প্রাণের উৎস। কিন্তু জীবন কোনো গাণিতিক যুক্তি বা সুনির্দিষ্ট ছক মেনে চলে না। এখানে আনন্দ ও দুঃখের অবস্থান সমানুপাতিক। জীবনের এই অনিশ্চয়তা আমাদের কাছে ভীতিকর, কারণ তা নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দাবি রাখে। আমরা অনিশ্চয়তাহীন স্বাচ্ছন্দ্য খুঁজি, যা জীবন দিতে অক্ষম। শক্তি আমাদের শেখায় যে, বেঁচে থাকার অর্থই হলো ক্রমাগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়া।

Shakti & Maya : শক্তিই মায়া, শক্তিই মুক্তি: বন্ধন ও মোচনের দিব্য লীলা

অন্তরের সুপ্ত শক্তি এবং আমাদের দ্বিধা

যখন আমরা দৈব শক্তির পূজা করি, আসলে আমরা নিজেদের ভেতরের সাহসিকতা, অদম্য ভালোবাসা এবং সৃজনশীল ক্ষমতারই প্রতিফলন দেখি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমরা বাইরে যাকে শ্রদ্ধা করি, নিজেদের ভেতরে তাকেই ভয় পাই। আমরা আমাদের পরিচিত গণ্ডি বা নিরাপত্তার বলয়ে থাকতেই ভালোবাসি। শক্তি যখন আমাদের সেই গণ্ডি পেরিয়ে জেগে ওঠার ডাক দেয়, তখন আমরা আতঙ্কিত হই। আসলে ভয়টা শক্তির নয়, ভয়টা হলো সেই ‘জাগরণের’ যা আমাদের পুরনো অভ্যাসগুলোকে তছনছ করে দিতে পারে।

প্রয়োজনীয় ধ্বংস ও রূপান্তর

রূপান্তর মানেই হলো কিছু হারানো, আর দেবী শক্তি মিথ্যে মায়ার প্রতি বিন্দুমাত্র করুণা দেখান না। শক্তির আরাধনা মানে কেবল সুখ বা সাফল্য প্রার্থনা নয়; তাঁর একটি প্রধান কাজ হলো ধ্বংস করা। এই ধ্বংস কোনো শাস্তি নয়, বরং নতুন সৃষ্টির জন্য জমি তৈরি করা। আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে এমন কিছু পুরোনো বিশ্বাস বা আসক্তি থাকে যা একসময় প্রয়োজন ছিল, কিন্তু এখন তা আমাদের উন্নতির পথে বাধা। শক্তি সেই মৃতপ্রায় কাঠামোগুলোকে আগুনের মতো পুড়িয়ে খাক করে দেন।

এই ধ্বংসের প্রক্রিয়ায় আমরা যা হারাবার ভয় পাই তা হলো:

  • আমাদের পুরনো পরিচিতি বা অহং।

  • পুরনো অন্ধবিশ্বাসের চুরমার হওয়া।

  • পরিচিত আবেগীয় আশ্রয়ের বিনাশ।

শক্তির এই প্রলয়ংকরী রূপ আমাদের পুরনো সত্তার মৃত্যুকে নিশ্চিত করে, যা মেনে নেওয়া একজন মানুষের পক্ষে সবচেয়ে কঠিন কাজ।

Maa Shakti : মাতৃশক্তি ও স্কন্দমাতার যোগসূত্র: সপ্ত মাতৃকা উপাসনার আধ্যাত্মিক তাৎপর্য

নারীত্ব মানেই কোমলতা নয়, এটি এক আপসহীন তেজ

আধুনিক সমাজে নারীত্বকে প্রায়ই কেবল কোমলতা বা নমনীয়তার মোড়কে দেখা হয়। কিন্তু দিব্য নারীসত্তা বা শক্তির রূপ কেবল এতে সীমাবদ্ধ নয়। শক্তির প্রকৃত রূপের মধ্যে রয়েছে:

  • প্রবল তেজ ও প্রচণ্ডতা।

  • সহজাত প্রজ্ঞা।

  • আপসহীন শক্তি ও বীরত্ব।

  • রূপান্তরের অগ্নিশিখা।

শক্তিকে কোনো ছকে বাঁধা যায় না, তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব। তিনি অদম্য, আর এই অনিয়ন্ত্রিত তেজই আমাদের মনে ভয়ের উদ্রেক করে।

উপসংহার: ভয় ও ভক্তি—একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ

শক্তির আরাধনা মানে জীবন ও নিজের দিব্য সম্ভাবনাকে সম্মান জানানো। আর শক্তিকে ভয় পাওয়া মানে হলো সেই রূপান্তরের মূল্য সম্পর্কে সচেতন হওয়া। এই ভয় কোনো বাধা নয়, বরং এটি উচ্চতর চেতনার দিকে এগিয়ে যাওয়ার এক দিকনির্দেশক। শক্তি আমাদের ভয়হীন হতে বলেন না, বরং তিনি ভয়কে সাথী করে সেই পরম সত্যের মুখোমুখি হতে শেখান যা আমাদের অন্তরেই বিরাজমান। শক্তি পূজিত হন কারণ তিনি প্রাণ দেন; শক্তি ভয়ের কারণ কারণ তিনি রূপান্তর ঘটান। আর এটাই জীবনের সবচেয়ে সাহসী ও প্রকৃত সত্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিশ্ব জুড়ে

গুরুত্বপূর্ণ খবর

বিশ্ব জুড়ে

গুরুত্বপূর্ণ খবর