mohini vishnu

ব্যুরো নিউজ,  ২৮শে নভেম্বর ২০২৫ : বিষ্ণুর দশাবতারের বিশাল প্রেক্ষাপটে রাম, কৃষ্ণ, নৃসিংহ বা বামনের মতো মহিমা-মণ্ডিত রূপগুলিই প্রধানত আলোচিত। কিন্তু এই ধারার মধ্যেই একটি অনন্য ও স্বল্পালোচিত রূপের অস্তিত্ব আছে—তিনি হলেন মোহিনী, বিষ্ণুর একমাত্র নারী অবতার। যদিও অধিকাংশ মানুষ তাঁকে ক্ষীরোদসাগরের মন্থনের সময় অমৃত বিতরণকারী মোহিনী রূপেই চেনেন, তবে তাঁর ভূমিকা সেই একক ঘটনাকে ছাপিয়ে অনেক দূর বিস্তৃত। পুরাণে মোহিনীর উপস্থিতি ক্ষণস্থায়ী হলেও অত্যন্ত শক্তিশালী, যা মায়া (Illusion), কামনা এবং দৈব শৃঙ্খলা ও বিশৃঙ্খলার মধ্যেকার ভারসাম্য নিয়ে গভীর প্রতীকী বার্তা বহন করে।

সমুদ্র মন্থনে মোহিনী

সমুদ্র মন্থনের কাহিনীটি মোহিনীর সর্বাধিক পরিচিত পর্ব। দেবতারা এবং অসুরেরা যখন অমৃত লাভের জন্য কূর্মের পিঠে পাহাড় রেখে সমুদ্র মন্থন করলেন, তখন অমৃত নিয়ে দেবতাদের মধ্যে বিবাদ শুরু হলো। বিশ্ব-শৃঙ্খলা রক্ষা করার জন্য বিষ্ণু এক অসাধারণ সুন্দরী নারীর রূপে আত্মপ্রকাশ করলেন—তিনিই মোহিনী। তাঁর মোহময়ী আকর্ষণে অসুরেরা মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। মোহিনী অত্যন্ত চাতুরীর সঙ্গে অসুরদের ভুলিয়ে দেবতাদের হাতে অমৃত তুলে দিলেন। এই ঘটনা মোহিনীকে নিছক সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে নয়, বরং দৈব কৌশলের মূর্ত প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে; যেখানে ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য স্বয়ং ঈশ্বর মায়াকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।

সনাতন ধর্মের মহাজাগতিক সংহতি : বিষ্ণুর অবতার ও নবগ্রহ

শিব ও মোহিনী: এক রহস্যময় মিলন

মোহিনীকে ঘিরে থাকা সবচেয়ে আকর্ষণীয় গল্পগুলির মধ্যে একটি হলো মহাদেব শিবের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ। মোহিনীর ক্ষমতা ও রূপের কথা শুনে শিব স্বয়ং সেই রূপটি দেখতে চাইলেন। বিষ্ণু সম্মত হলেন এবং পুনরায় মোহিনী রূপে আবির্ভূত হলেন, যাঁর রূপের জ্যোতি ছিল তুলনাহীন। মহাযোগী হওয়া সত্ত্বেও শিব সেই রূপে বিমোহিত হলেন। তাঁদের এই মিলনে আয়াপ্পা (যিনি হরিহরপুত্র নামেও পরিচিত) নামক এক দেবশিশুর জন্ম হয়, যিনি বিষ্ণু (হরি) এবং শিব (হর)-এর সন্তান হিসেবে কেরালায় পূজিত হন। এই গল্পটি বিপরীতের প্রতীকী মিলন—যেমন সন্ন্যাস ও কামনার মিলন, পুংলিঙ্গ ও স্ত্রীলিঙ্গ শক্তির মিলনকে সূচিত করে, যা দৈব সৃষ্টির পূর্ণতাকে দেখায়।

অসুর বিনাশে মোহিনীর কৌশল

সমুদ্র মন্থনের পর মোহিনী বিলীন হয়ে যাননি। তিনি অন্যান্য গল্পেও আবির্ভূত হয়েছেন, প্রতিবারই অসুরদের প্রতারণা করে বিশ্ব-শৃঙ্খলা রক্ষা করেছেন। একটি কাহিনীতে তিনি ভস্মাসুর নামক এক অসুরকে মুগ্ধ করেছিলেন। ভস্মাসুর মহাদেবের কাছ থেকে বর পেয়েছিল যে সে যার মাথায় হাত দেবে, সে-ই পুড়ে ভস্ম হয়ে যাবে। মোহিনীর নৃত্য সেই অসুরকে এমনভাবে প্রলুব্ধ করেছিল যে সে তাঁর নাচের অঙ্গভঙ্গি নকল করতে গিয়ে নিজের মাথায় নিজেই হাত দিয়ে নিজেকে ভস্ম করে ফেলে। এই গল্পগুলির মাধ্যমে মোহিনী প্রমাণ করেন যে মায়া শুধু নিরীহদের আঘাত করার জন্য নয়, বরং যখন কেবল শক্তি দিয়ে ধর্ম রক্ষা করা যায় না, তখন কৌশল ও মায়াও ধর্মরক্ষার অস্ত্র হতে পারে।

Maa Sita : সীতা: জন্ম মৃত্তিকায়, চেতনা প্রকৃতিতে — এক সনাতন নারীশক্তির আখ্যান

মোহিনীর প্রতীকীবাদ: মায়া ও ভারসাম্যতা

মোহিনীর ভূমিকা কেবল মুগ্ধতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হিন্দু দর্শনে:

  • মায়া (Illusion): মোহিনী ‘মায়া’ বা বিভ্রমের শক্তিকে তুলে ধরেন, যে শক্তি জ্ঞানী ব্যক্তিকেও বিভ্রান্ত করতে পারে, আবার ভক্তদের সত্যের দিকেও পরিচালিত করতে পারে।

  • অনিত্যতা: তাঁর ক্ষণস্থায়ী উপস্থিতি দেখায় যে সৌন্দর্য ও কামনা ক্ষণস্থায়ী; শাশ্বত হলো প্রজ্ঞা এবং ভারসাম্য।

  • দ্বৈততার সামঞ্জস্য: শিবের সাথে তাঁর মিলন বিপরীতের সমন্বয়কে প্রতিফলিত করে, যা মনে করিয়ে দেয় যে সৃষ্টি নিজেই দ্বৈততা থেকে জন্ম নেয়।

  • কৌশল: অসুরদের প্রতি তাঁর চাতুরী প্রতিফলিত করে যে বিশ্ব-শৃঙ্খলা সংরক্ষণের জন্য কেবল শক্তির চেয়েও বেশি কিছু প্রয়োজন, কৌশল অপরিহার্য।

অন্যান্য অবতারদের মতো মোহিনী দীর্ঘকাল পৃথিবীতে থাকেন না। তিনি কেবল সংকটের মুহূর্তে আবির্ভূত হন, তাঁর মায়া ও আকর্ষণ ব্যবহার করে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনেন এবং তারপর চিহ্ন না রেখে অদৃশ্য হয়ে যান। হয়তো সেই কারণেই তিনি বিষ্ণুর অন্যতম রহস্যময় এবং স্বল্প আলোচিত অবতার রূপে রয়ে গেছেন। মোহিনী আমাদের শেখান যে মায়া নিজে খারাপ নয়, এর ব্যবহার নির্ভর করে উদ্দেশ্যর উপর। যখন ধর্ম দ্বারা পরিচালিত হয়, তখন মায়াও মঙ্গলের শক্তি হতে পারে। তাঁর ক্ষণস্থায়ী রূপে তিনি মনে করিয়ে দেন যে সত্য প্রায়শই বাহ্যিক রূপের আড়ালে লুকিয়ে থাকে এবং প্রজ্ঞা সেই পর্দা সরিয়ে দেখার মধ্যেই নিহিত।

বিশ্ব জুড়ে

গুরুত্বপূর্ণ খবর

বিশ্ব জুড়ে

গুরুত্বপূর্ণ খবর