ব্যুরো নিউজ ১৯ জুলাই ২০২৫ : শুনতে অবাক লাগলেও, খুব শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে কোটি কোটি বিশেষ ধরনের মাছি ছড়ানো হবে। তবে এটি কোনো বিপদ ডেকে আনার চেষ্টা নয়, বরং Cochliomyia hominivorax নামক এক মারাত্মক মাংসখেকো কীটের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অংশ। টেক্সাসসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গবাদিপশুকে রক্ষা করতেই মার্কিন প্রশাসন এই অভিনব উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যা ষাট ও সত্তরের দশকে সফলভাবে ব্যবহৃত একটি পুরনো কৌশলকে ফিরিয়ে আনছে।
সমস্যার মূলে ভয়ংকর ‘স্ক্রুওর্ম’: এক মারাত্মক হুমকি
এই অভিনব উদ্যোগের মূলে রয়েছে এক ভয়ংকর মাংসখেকো মাছি, যার বৈজ্ঞানিক নাম Cochliomyia hominivorax। এর লার্ভা, যাকে বলা হয় ‘নিউ ওয়ার্ল্ড স্ক্রুওর্ম’ (new world screwworm) , জীবন্ত প্রাণীর ক্ষতস্থানে প্রবেশ করে দ্রুত মাংস খেতে শুরু করে। মাত্র এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যেই আক্রান্ত পশুটি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এমনকি মানুষও এই কীটের আক্রমণ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্ত্রী মাছি ক্ষতস্থানে গিয়ে ২০০ থেকে ৩০০ ডিম পাড়ে, যা ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লার্ভায় রূপান্তরিত হয়। এরপরই শুরু হয় মাংস খাওয়ার সেই ভয়ংকর অধ্যায়। বর্তমানে এর বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর টিকা নেই, তাই আক্রান্ত পশুর ক্ষেত্রে পরিচর্যা, অ্যান্টিসেপটিক ব্যবহার এবং ক্ষত ঢেকে রাখাই একমাত্র উপায়।
২০২৩ সালে এই লার্ভার উপদ্রব শুরু হয় মধ্য আমেরিকায়, যা পরবর্তীতে মেক্সিকোতেও ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত অঞ্চলের পশুবাজার ও বন্দরগুলো পর্যন্ত সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছিল, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছিল।
Delhi Artificial Rains : বায়ুদূষণ মুক্তিতে দিল্লির অভিনব প্রচেষ্টা ! কৃত্রিম বর্ষা !!
পুরনো কৌশল ফিরছে: ‘নির্বীজ মাছি’ পদ্ধতির কার্যকারিতা
তবে আশার কথা হলো, এই ভয়ংকর সমস্যার বিরুদ্ধে একসময় সফলভাবে লড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ষাট ও সত্তরের দশকে তারা এক অভিনব পদ্ধতিতে প্রজননে অক্ষম পুরুষ মাছি (Sterile Insect Technique – SIT) ছড়িয়ে দিয়ে এই কীট দমন করেছিল। এই পদ্ধতির মূল ভিত্তি হলো স্ত্রী মাছি একবারই মিলনে আগ্রহী হয়; যখন সে নিষ্ক্রিয় পুরুষের সঙ্গে মিলিত হয়, তখন নতুন প্রজন্ম জন্মায় না। ফলে প্রজনন চক্র থেমে যায় এবং ধীরে ধীরে এই কীটের বংশবিস্তার বন্ধ হয়ে যায়।
সেই পরীক্ষিত পুরনো কৌশল আবার ফিরিয়ে আনতে চাচ্ছে মার্কিন প্রশাসন। ২০২৪ সালের জুনে আইনপ্রণেতারা একটি চিঠির মাধ্যমে এই পদ্ধতির প্রয়োগের সুপারিশ করেন। এরপরই সিদ্ধান্ত হয়, টেক্সাসের হিডালগোতে একটি ‘মাছি উৎপাদন কারখানা’ গড়ে তোলা হবে। এই প্রকল্পে প্রতি সপ্তাহে ১০ কোটি অক্ষম মাছি আকাশপথে ছড়ানো হবে।
ব্যয়বহুল হলেও অর্থনীতি বাঁচাতে সার্থক বিনিয়োগ
এই কাজটি পরিচালনা করছে COPEG, যা যুক্তরাষ্ট্র ও পানামার যৌথ কমিশন। এই প্রকল্পের জন্য প্রতি বছর প্রায় ৮৫ লাখ ডলার (প্রায় ৭২ কোটি টাকা) ব্যয় হতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে, আর মাছি উৎপাদন স্থাপনাটি তৈরি করতে লাগতে পারে প্রায় ৩০ কোটি ডলার (প্রায় ২৫২ কোটি টাকা)। তবে গবাদিপশু শিল্পকে বাঁচাতে এই খরচ সার্থক বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
অধ্যাপক ফিলিপ কাফম্যানের মতে, স্ত্রী মাছিরা সাধারণত ২০ দিন বাঁচে এবং জীবনে একবারই মিলন করে। এই প্রকল্প সফল হলে, কয়েক মাসের মধ্যেই স্ক্রুওর্মের উপদ্রব দমন সম্ভব হবে।
Rocky : বিপর্যস্ত হিমাচলের এক ‘নীরব নায়ক’-এর গল্প
উপসংহার: মাছি দিয়ে মাছির বিরুদ্ধে যুদ্ধ
মোট কথা, মাছি দিয়েই মাছির বিরুদ্ধে যুদ্ধ—এবারও যুক্তরাষ্ট্র তাকেই বেছে নিয়েছে। এই লড়াই শুধু গবাদিপশু রক্ষা নয়, এটি এক বিশাল কৃষি অর্থনীতিকে বাঁচানোরও সংগ্রাম। এই অভিনব এবং বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত পদ্ধতিটি ভবিষ্যতে অন্যান্য কৃষি বিষয়ক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির স্থাপন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।