ব্যুরো নিউজ, ৩০শে জানুয়ারী ২০২৬ : ভারতীয় পুরাণ ও মহাকাব্যের বিশাল ক্যানভাসে নারীদের শুধুমাত্র দয়া বা মমতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়নি, বরং তাঁদের চিত্রিত করা হয়েছে এক অত্যন্ত শক্তিশালী ও বহুমাত্রিক রূপে। বেদ, পুরাণ, রামায়ণ এবং মহাভারতের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, নারীরা সেখানে কোথাও রণচণ্ডী ‘শক্তি’, কোথাও অটল ‘ভক্তি’, আবার কোথাও প্রচলিত প্রথার বিরুদ্ধে এক জোরালো ‘বিদ্রোহ’।
শক্তির আধার: দিব্য নারীত্বের প্রকাশ
হিন্দুধর্মে ‘শক্তি’ ধারণাটি নারীত্বের দিব্য ক্ষমতারই প্রতিফলন। ‘দেবী মাহাত্ম্যম’-এ আমরা দেবী দুর্গাকে দেখি এক পরম যোদ্ধা হিসেবে। দেবতারা যখন মহিষাসুরের অত্যাচারে কূলকিনারা পাচ্ছিলেন না, তখন তাঁদের সম্মিলিত তেজ থেকে সৃষ্টি হলেন দুর্গা। তিনি প্রমাণ করলেন যে, অশুভ বিনাশে নারীশক্তিই অপরিহার্য।
আবার দেবী কালীর রূপটি আরও আদিম ও অদম্য। তিনি কেবল গৃহিণী বা পালিকা নন, বরং তিনি সময়ের নিয়ন্ত্রক এবং বিনাশের কাণ্ডারি। কালীর এই রূপটি সমাজের প্রথাগত ‘শান্ত নারী’র ধারণাকে ভেঙে দিয়ে প্রমাণ করে যে, নারীত্ব মানেই কেবল নমনীয়তা নয়, বরং তা প্রয়োজনে রুদ্র ও সংহারকও হতে পারে। এমনকি ঋগ্বেদেও বাক (বাগদেবী) এবং ঊষার (ভোর) আরাধনা নারীর বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক শ্রেষ্ঠত্বেরই প্রাচীন প্রমাণ।
Maa Shakti : শক্তির আরাধনা: ভক্তি ও ভীতির এক অপূর্ব সহাবস্থান
ভক্তি ও সহনশীলতার প্রতিমূর্তি
ভারতীয় পুরাণ নারীকে চরম ধৈর্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছে, যা অনেক সময় তাঁর নীরব বিদ্রোহেরই নামান্তর। সীতা তাঁর একনিষ্ঠ স্বামীভক্তি ও সহনশীলতার জন্য পরিচিত হলেও, শেষ পর্যন্ত ধরিত্রীর কোলে ফিরে যাওয়ার মাধ্যমে তিনি আসলে তৎকালীন সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধেই এক নিঃশব্দ প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।
একইভাবে মহাভারতের দ্রৌপদী কেবল একজন ভক্ত বা স্ত্রী নন, বরং তিনি আত্মসম্মানের মূর্ত প্রতীক। কৌরব সভায় যখন তাঁর বস্ত্রহরণের চেষ্টা করা হয়, তখন তিনি শ্রীকৃষ্ণের চরণে আত্মনিবেদন করার পাশাপাশি পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থার কাছে মাথা নত করতে অস্বীকার করেন। তাঁর এই অপমানের প্রতিশোধের সংকল্পই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। মধ্যযুগীয় কবি-সাধিকা মীরাবাঈ-এর কাহিনীও আমাদের শেখায় কীভাবে ভক্তি ও প্রেমের টানে সমাজের সব নিয়ম ও বৈবাহিক শৃঙ্খল উপেক্ষা করা যায়।
সমাজ ও প্রথার বিরুদ্ধে বিদ্রোহিনী
পুরাণের অনেক নারী চরিত্রই তাঁদের প্রজ্ঞা ও তেজ দিয়ে তৎকালীন সমাজকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন। রাবণের স্ত্রী মন্দোদরী রাবণকে বারবার সতর্ক করেছিলেন অধর্মের পথ থেকে সরে আসতে। যদিও তাঁর কথা গ্রাহ্য করা হয়নি, তবুও তিনি শোষণের বিরুদ্ধে এক নৈতিক প্রতিরোধের কন্ঠস্বর হিসেবে অম্লান।
ঋষি অত্রির স্ত্রী অনসূয়া তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তিতে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরকেও নতি স্বীকার করতে বাধ্য করেছিলেন। আবার উপনিষদের যুগে আমরা পাই গার্গী বাচকনবী-র মতো অসামান্য দার্শনিককে। তিনি সেই যুগে যাজ্ঞবল্ক্যের মতো ঋষিকে কঠিন তাত্ত্বিক প্রশ্নে কোণঠাসা করেছিলেন। গার্গীর এই বিদ্যাবুদ্ধি ও সাহস আজও নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা জোগায়।
Aranyanvi Devi : অরণ্যানী: অরণ্যের নিভৃত দেবী ও প্রকৃতির প্রাণশক্তি
উপসংহার
সংক্ষেপে বলতে গেলে, ভারতীয় শাস্ত্র ও পুরাণ কেবল নারীকে অবদমিত বা গৌণ হিসেবে দেখায়নি। সেখানে দুর্গার ক্ষমতা, সীতার সহনশীলতা, গার্গীর প্রজ্ঞা এবং দ্রৌপদীর তেজ—সব মিলিয়ে নারীত্বের এক পূর্ণাঙ্গ রূপ প্রকাশিত হয়েছে। আজকের আধুনিক সমাজেও এই চরিত্রগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ভক্তি আর বিদ্রোহ পরস্পরবিরোধী নয়, বরং এগুলি একই আধ্যাত্মিক সত্তার ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ।




















