শুদ্ধাত্মা মুখার্জি , ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ : দীর্ঘ এক বছরের শুল্ক যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে ভারত ও আমেরিকা এক ঐতিহাসিক বাণিজ্য চুক্তিতে উপনীত হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ফোনালাপের পর ভারতীয় রপ্তানি পণ্যের ওপর শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশ করার ঘোষণা করা হয়েছে। তবে এই চুক্তির আড়ালে রাশিয়ার থেকে তেল আমদানি বন্ধের যে কঠোর শর্ত আমেরিকা আরোপ করেছে, তা ভারতের কৌশলগত স্বার্থের পরিপন্থী হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে।
ইইউ-ভারত চুক্তির চাপেই কি নতিস্বীকার ওয়াশিংটনের?
সবথেকে আশ্চর্যের বিষয় হলো, ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) সম্পন্ন হওয়ার ঠিক পরেই ট্রাম্প প্রশাসন এই ঘোষণা করল। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইউরোপের বাজারের সাথে ভারতের ঘনিষ্ঠতা দেখে আমেরিকা একপ্রকার চাপে পড়েই এই সমঝোতায় এসেছে। যে হোয়াইট হাউস এতদিন রাশিয়ার থেকে তেল কেনার অজুহাতে ভারতকে বাণিজ্যিকভাবে কোণঠাসা করতে চেয়েছিল, তারাই হঠাৎ তড়িঘড়ি চুক্তিতে রাজি হওয়া প্রমাণ করে যে, ভারত এখন বৈশ্বিক বাণিজ্যে এক শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। ফলে কোনো একতরফা ভূ-রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার বাধ্যবাধকতা ভারতের ওপর থাকছে না বলেই মনে করা হচ্ছে।
India US Trade Deal : ‘কৃষকদের স্বার্থে কোনো আপস নয়’: মার্কিন চুক্তিতে ঘরোয়া কৃষি ও দুগ্ধ শিল্প রক্ষার গ্যারান্টি পীযূষ গোয়েলের
রাশিয়ার তেলের বিকল্প ও নতুন রুট: ভ্লাদিভোস্তক ফ্যাক্টর
আমেরিকা দাবি করছে যে ভারত রাশিয়ার তেল কেনা কেবল কমাবে না, বরং পুরোপুরি ‘বন্ধ’ করবে। কিন্তু ভারতের বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন:
ইরান ও চাবাহার সংকট: রাশিয়ার তেল আসার প্রথাগত পথ ‘ইন্টারন্যাশনাল নর্থ-সাউথ ট্রানজিট করিডোর’ (INSTC) বর্তমানে ইরান পরিস্থিতির কারণে অনিশ্চিত। এমনকি ২০২৬-এর বাজেটে চাবাহার বন্দরে ভারতের বরাদ্দ কমাও এর ইঙ্গিত দেয়।
ভ্লাদিভোস্তক রুট: ভারত হাত গুটিয়ে বসে নেই। রাশিয়ার বিনিয়োগে তৈরি হচ্ছে ১২টিরও বেশি বিশাল অয়েল ট্যাঙ্কার, যা ভ্লাদিভোস্তক বন্দর হয়ে সরাসরি ভারতে তেল নিয়ে আসবে। অর্থাৎ, ইরানের ওপর নির্ভরতা কমলেও রাশিয়ার সাথে জ্বালানি সম্পর্ক ছিন্ন করার কোনো পরিকল্পনা দিল্লির নেই।
সস্তা জ্বালানি ও ভেনিজুয়েলা সমীকরণ
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে চুক্তির পর ভারতের পেট্রো-জাত পণ্য রপ্তানির সুযোগ বহুগুণ বেড়েছে। এই বাজারের চাহিদা মেটাতে ভারতের সস্তা ও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি প্রয়োজন। যদিও আমেরিকা ভেনিজুয়েলার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ভারতকে রাশিয়ার থেকেও কম দামে তেল দেওয়ার প্রলোভন দেখাচ্ছে, তবুও রাশিয়ার মতো দীর্ঘস্থায়ী ও বিশ্বস্ত সঙ্গীকে ভারত এখনই ত্যাগ করতে নারাজ।
India US Trade Deal : ভারত-মার্কিন বাণিজ্য যুদ্ধে ইতি: ১৮ শতাংশ শুল্কে সিলমোহর মোদি-ট্রাম্পের, দেশীয় রাজনীতিতে তুঙ্গে বিতর্ক
রুপি-রুবল বাণিজ্য ও সামরিক সখ্যতা
তেল ছাড়াও রাশিয়ার সাথে ভারতের সম্পর্ক বহুমাত্রিক। ডলার বর্জন করে ‘রুপি-রুবল’ পদ্ধতিতে বাণিজ্য, সামরিক সরঞ্জাম এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দুই দেশ এখন একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশীদার। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ট্রাম্প প্রশাসনকে সন্তুষ্ট করতে ভারত হয়তো সাময়িকভাবে রাশিয়া থেকে তেল আমদানি কিছুটা কমাতে পারে, কিন্তু পুরোপুরি বন্ধ করা ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য আত্মঘাতী হবে।
উপসংহার
ভারত-মার্কিন এই চুক্তিকে ভারত সরকার একটি ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতি হিসেবে দেখালেও, তেলের শর্ত নিয়ে আগামী দিনে দিল্লি ও ওয়াশিংটনের মধ্যে টানাপড়েন অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। ভারত একদিকে যেমন আমেরিকার সাথে বাণিজ্য বাড়াতে চায়, ঠিক তেমনি নিজের ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ (Strategic Autonomy) বজায় রাখতেও বদ্ধপরিকর।


















