Vasant Panchami in Vrindavan

ব্যুরো নিউজ, ২২শে জানুয়ারী ২০২৬ : ভারতের অধিকাংশ প্রান্তে বসন্ত পঞ্চমী মানেই দেবী সরস্বতীর আরাধনা। হাতেখড়ি, বইপত্রের স্তূপ আর বিদ্যার দেবীর কাছে প্রজ্ঞা ও স্বচ্ছতার প্রার্থনা—এটাই দস্তুর। কিন্তু শ্রীধাম বৃন্দাবনে এই দিনটি এক সম্পূর্ণ ভিন্ন বার্তা নিয়ে আসে। এখানে বসন্ত পঞ্চমী আপনার বুদ্ধির পরিমাপ করে না, বরং আপনার হৃদয়ের গভীরতা জানতে চায়। এখানে হলুদ রঙ কেবল পাণ্ডিত্যের প্রতীক নয়, বরং তা শ্রীকৃষ্ণের পীতাম্বর আর হৃদয়ের উষ্ণতার বহিঃপ্রকাশ।

১. বসন্ত এখানে ঋতু নয়, এক দিব্য স্মৃতি

বৃন্দাবনে বসন্ত পঞ্চমী কেবল জলবায়ুর পরিবর্তন নয়, এটি এক আধ্যাত্মিক জাগরণ। যমুনা পুলিন, কুঞ্জবন আর মন্দিরগুলোতে এক অদ্ভুত কোমলতা ফিরে আসে। ব্রজবাসীর বিশ্বাস, বসন্ত হলো সেই সময় যখন প্রকৃতি আবার ভালোবাসার যোগ্য হয়ে ওঠে। শীতের রূঢ়তা কাটিয়ে প্রেমের কোমল পরশ অনুভব করাই এখানকার বসন্তের প্রকৃত উদ্দেশ্য।

Lord Krishna : গোবিন্দ ও গো-রক্ষা: ধর্ম, অহিংসা এবং ঐশ্বরিক সম্পর্কের তাৎপর্য

২. জ্ঞানের চেয়ে ‘ভাব’ বড়

দেবী সরস্বতী শৃঙ্খলা, ব্যাকরণ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের প্রতীক। কিন্তু বৃন্দাবনের আধ্যাত্মিক দর্শনে ঈশ্বরকে বোঝার চেয়ে তাঁকে অনুভব করা বেশি জরুরি। বৃন্দাবন সরস্বতীকে অস্বীকার করে না, কিন্তু এখানে মুখ্য হলো ‘ভাব’। জ্ঞান অনেক সময় অহংকারের জন্ম দিতে পারে, কিন্তু প্রেম সেই অহংকারকে গলিয়ে দেয়। তাই এই দিনে ব্রজধামে সরস্বতী পূজা গৌণ হয়ে দাঁড়ায়, মুখ্য হয়ে ওঠে হৃদয়ের সমর্পণ।

৩. হোলি উৎসবের আধ্যাত্মিক সূচনা

বৃন্দাবনে বসন্ত পঞ্চমী কোনো বিচ্ছিন্ন উৎসব নয়। এটি হলো হোলির দীর্ঘ যাত্রাপথের প্রথম পদক্ষেপ। বসন্ত পঞ্চমী যদি প্রেমের জাগরণ হয়, তবে হোলি হলো সেই প্রেমের পূর্ণ প্রকাশ। এই দুয়ের মাঝে থাকে দীর্ঘ প্রতীক্ষা, বিরহ আর অন্তরের প্রস্তুতি। বসন্ত পঞ্চমীর দিন থেকেই আবির খেলার সূচনার মাধ্যমে এক অলৌকিক প্রেমচক্র শুরু হয়।

৪. রাধাতত্ত্ব ও বসন্তের যোগসূত্র

বৃন্দাবনে শ্রীরাধা কেবল কৃষ্ণের সঙ্গিনী নন, তিনি স্বয়ং প্রেমের মূর্ত প্রতীক। কথিত আছে, কৃষ্ণের প্রস্থানের পর বৃন্দাবনের ধুলিকণা রাধার বিরহ ও স্মৃতিতে জীবন্ত হয়ে আছে। বসন্ত পঞ্চমী হলো সেই সময় যখন সেই অবদমিত প্রেম ও স্মৃতি আবার নতুন করে পল্লবিত হয়। রাধার এই নিবিড় আবেগপ্রবণ জগতের সঙ্গে সরস্বতীর বৌদ্ধিক শক্তির চেয়ে হৃদয়ের টান অনেক বেশি গভীর।

৫. কামদেব ও দিব্য বাসনা

পুরাণে বসন্ত পঞ্চমীকে কামদেবের আবির্ভাবের সাথেও যুক্ত করা হয়। তবে বৃন্দাবনে কাম মানে শারীরিক আকর্ষণ নয়, বরং তা হলো ‘দিব্য ব্যাকুলতা’ বা ঈশ্বরের প্রতি তীব্র টান। বসন্তের আগমনে এই ব্যাকুলতা বা লংগিং (longing) আবার ফিরে আসে, যা ভক্তিপথের অন্যতম প্রধান রসদ।

৬. পীতবর্ণ: জ্ঞানের অতীত এক অনুভূতি

সাধারণত হলুদ রঙ সরস্বতীর প্রতীক, যা স্বচ্ছতা ও শিক্ষার দ্যোতক। কিন্তু বৃন্দাবনে এই হলুদ রঙ হলো সর্ষে ফুলের সমারোহ, কৃষ্ণের পীতধড়া এবং নব-অনুরাগের চিহ্ন। এখানে হলুদ রঙ তীক্ষ্ণ বুদ্ধির নয়, বরং এক শান্ত ও গভীর অনুরাগের প্রতিফলন।

Lord Krishna : গোবর্ধন পর্বতের প্রেম কাহিনী থেকে জন্ম নেওয়া ছাপ্পান্ন ভোগের রহস্য !

উপসংহার: প্রেমের পরম জ্ঞান

বৃন্দাবনের আধ্যাত্মিক সিঁড়িতে জ্ঞানের চেয়ে প্রেমকে উচ্চস্থান দেওয়া হয়েছে। কারণ, যেখানে জ্ঞান শেষ হয়, সেখান থেকেই প্রেমের শুরু। বসন্ত পঞ্চমী আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, তাত্ত্বিক পড়াশোনা বা পাণ্ডিত্য দিয়ে ঈশ্বরকে পাওয়া যায় না; তাঁকে পেতে হলে প্রয়োজন বসন্তের মতো এক নমনীয় ও উর্বর হৃদয়। যেখানে সম্মান ও প্রেম মিলিত হয়, সেখানেই দেবী লক্ষ্মী আর সরস্বতী দুজনেই প্রেমের চরণে আশ্রয় খোঁজেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিশ্ব জুড়ে

গুরুত্বপূর্ণ খবর

বিশ্ব জুড়ে

গুরুত্বপূর্ণ খবর