ব্যুরো নিউজ ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ : অভিনেতা-নেতা এবং তামিলাগা ভেট্রি কাজাগাম (TVK) প্রধান বিজয়ের শনিবারের রাজনৈতিক জনসভায় পদদলিত হয়ে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। এই মর্মান্তিক ঘটনায় বহু শিশুসহ কমপক্ষে ৩৬ জনের প্রাণহানি হয়েছে এবং ৭০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। কারুর জেলা সদর হাসপাতাল এবং পরে ইরোড ও তিরুচিরাপল্লী মেডিকেল কলেজে আহতদের স্থানান্তরিত করা হয়েছে।
অনিয়ন্ত্রিত ভিড়ই দুর্ঘটনার কারণ
কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জনসভার অনুমতি পত্রে ১০,০০০ লোকের সমাগমের কথা বলা হলেও, বাস্তবে কমপক্ষে ৩০,০০০ লোক উপস্থিত হয়েছিল, যা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি। ভিড় ক্রমশ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে ওঠে এবং কিছু লোক অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার পর বিশৃঙ্খলা শুরু হয়। অভিনেতা-নেতা বিজয়ের জনসভাস্থলে পৌঁছাতে ছয় ঘণ্টারও বেশি দেরি হওয়ায় ভিড় আরও বেড়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, অভিনেতা-নেতার এক ঝলক দেখার জন্য জনতার ভিড় মঞ্চের দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করে, ফলে অত্যধিক ভিড়, গরম ও জায়গার অভাবে অনেকের শ্বাসরোধ হয়ে আসে। পরিস্থিতি খারাপ হতে দেখে বিজয় তাঁর ভাষণ মাঝপথে থামিয়ে দেন এবং ভিড়ের মধ্যে জল সরবরাহ করার জন্য নিজেই বোতল ছুঁড়তে থাকেন। এমনকি বিশৃঙ্খলার মধ্যে হারিয়ে যাওয়া শিশুদের খুঁজে বের করার জন্যও তিনি কথা বলতে শোনা যায়।
উদ্ধারকার্যে বাধা ও মানবিক শৃঙ্খল
দুর্ঘটনার ফলে যখন মানুষ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে পদদলিত হতে শুরু করে, তখন আহতদের কাছে পৌঁছাতে অ্যাম্বুলেন্সকে মারাত্মক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। ভিড়ের কারণে রাস্তা পুরোপুরি জ্যাম হয়ে গিয়েছিল। পরে স্বেচ্ছাসেবক ও পুলিশ সদস্যরা মানুষের ‘মানবিক শৃঙ্খল’ (human chains) তৈরি করে আহতদের দ্রুত হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।
নিহতদের মধ্যে ১০ জন শিশু ও ১৭ জন মহিলা ছিলেন বলে কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন।
মুখ্যমন্ত্রীর শোক ও ক্ষতিপূরণ ঘোষণা
ঘটনার তীব্রতা উপলব্ধি করে মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্টালিন গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি অবিলম্বে কর্মকর্তাদেরকে আহতদের চিকিৎসা সহায়তা প্রদানের নির্দেশ দেন এবং পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে নিজে কারুর সফরের ঘোষণা করেন।
মুখ্যমন্ত্রী স্টালিন মৃতদের পরিবারের জন্য মুখ্যমন্ত্রীর জনস্বস্তি তহবিল (Chief Minister’s Public Relief Fund) থেকে ১০ লক্ষ টাকা এবং হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যায় থাকা আহতদের জন্য ১ লক্ষ টাকা করে আর্থিক ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করেছেন।
বিচার বিভাগীয় তদন্ত ও কেন্দ্রীয় পদক্ষেপ
এই ঘটনার পরিস্থিতিতে তদন্ত করার জন্য মুখ্যমন্ত্রী স্টালিন একজন অবসরপ্রাপ্ত হাইকোর্টের বিচারকের নেতৃত্বে এক-সদস্যের বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন।
অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্টালিনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক (MHA) রাজ্য সরকারের কাছে একটি বিশদ রিপোর্ট তলব করেছে।
বিজয় ও অন্যান্য নেতাদের শোকবার্তা
এই দুর্ঘটনার পরে, অভিনেতা-নেতা বিজয় প্রথমে চেন্নাইয়ে ফিরে এসে নীরব থাকলেও পরে একটি বিবৃতিতে তাঁর বেদনা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “আমার হৃদয় চূর্ণ হয়ে গেছে, অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করছি,” এবং এটিকে এক অসহনীয় ক্ষতি বলে বর্ণনা করেন।
এছাড়া রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী মোদী X-এ (পূর্বে টুইটার) পোস্টে লিখেছেন, “যারা তাদের প্রিয়জনদের হারিয়েছেন, তাদের পরিবারের প্রতি আমার সমবেদনা রইল। এই কঠিন সময়ে তারা যেন শক্তি পান। আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করি।” রাজ্যের অন্যান্য রাজনৈতিক নেতারাও শোক প্রকাশ করে এমন ঘটনা ভবিষ্যতে রোধ করার জন্য দায়বদ্ধতা নির্দিষ্ট করার আহ্বান জানিয়েছেন।
এই ঘটনা তামিলনাড়ুতে রাজনৈতিক জনসভায় ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং ইভেন্ট ব্যবস্থাপনার বিষয়ে গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করেছে, বিশেষ করে অপ্রত্যাশিতভাবে বিশাল জনসমাগমের পরিপ্রেক্ষিতে।



















