ব্যুরো নিউজ, ১৯শে নভেম্বর ২০২৫ : ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসের সরকার-বিরোধী বিক্ষোভ চলাকালীন সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) সোমবার মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে চলা এই বিচারপ্রক্রিয়ায় ট্রাইব্যুনাল তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করেছে। এই রায়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে গত বছর ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন দমন করতে তিনি মারাত্মক অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন।
আদালতের রায় ও শাস্তি
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল তাদের ৪৫৩ পৃষ্ঠার রায়ে জানায়, শেখ হাসিনা-সহ তিন আসামির বিরুদ্ধে আনা পাঁচটি অভিযোগই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
শেখ হাসিনা (প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী): মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড। (উসকানিমূলক বক্তব্যের জন্য আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণের নির্দেশসহ চানখাঁরপুল ও আশুলিয়া হত্যার অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে)। আদালত তার দেশের অভ্যন্তরের সকল সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দিয়েছে।
আসাদুজ্জামান খান কামাল (প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী): মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড।
চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুন (প্রাক্তন পুলিশ প্রধান): রাজসাক্ষী হওয়ায় শাস্তি লঘু করে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড।
ট্রাইব্যুনাল জানায়, জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর বিক্ষোভে আনুমানিক ১,৪০০ জন নিহত এবং প্রায় ২৪,০০০ জন আহত হয়েছিলেন। ট্রাইব্যুনাল আরও উল্লেখ করে যে, শেখ হাসিনার সরকার বিক্ষোভকারীদের দমন করতে হেলিকপ্টার-সহ প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছিল।
রায় নিয়ে শেখ হাসিনার প্রতিক্রিয়া
বর্তমানে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনা এই রায়কে ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ এবং ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। রায় ঘোষণার পর এক বিবৃতিতে তিনি বলেন,
“আমার বিরুদ্ধে আনা ট্রাইব্যুনালের সব অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করছি। এই রায় একটি ‘সাজানো ট্রাইব্যুনাল’ কর্তৃক দেওয়া হয়েছে, যা অনির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠা করেছে। মৃত্যুদণ্ডের রায়ের মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের চরমপন্থী ব্যক্তিত্বদের নির্লজ্জ এবং খুনি মনোভাবের প্রকাশ ঘটেছে।”
তিনি তার সরকারের মানবাধিকারের রেকর্ড এবং ১৫ বছরে জিডিপি-তে ৪৫০% বৃদ্ধি, লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গার আশ্রয়দান-এর মতো সাফল্য তুলে ধরে ট্রাইব্যুনালের অভিযোগগুলি ‘সমানভাবে প্রমাণহীন’ বলে দাবি করেন। তিনি তার সমর্থকদের ধৈর্যশীল ও দৃঢ় থাকার আহ্বান জানান।
প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের প্রতিক্রিয়া
রায় প্রকাশের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস তার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি বলেন,
“আজ বাংলাদেশের আদালত এমন এক স্পষ্টতার সঙ্গে রায় দিয়েছে, যা দেশজুড়ে এবং দেশের সীমানা পেরিয়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। এই দণ্ড ও সাজা একটি মৌলিক নীতি পুনর্ব্যক্ত করেছে— ক্ষমতা যা-ই হোক না কেন, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।”
তিনি বলেন, এই রায় জুলাই-আগস্টের বিক্ষোভে ক্ষতিগ্রস্ত হাজার হাজার মানুষের জন্য আংশিক ন্যায়বিচার এনেছে। ইউনূস আরও বলেন, এই রায় গণতন্ত্রের ভিত্তি পুনর্নির্মাণের একটি সুযোগ এনেছে, যা বছরের পর বছর ধরে দমন-পীড়নের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
মামলার প্রেক্ষাপট ও বর্তমান পরিস্থিতি
গ্রেফতার ও বিচার: শেখ হাসিনা (৭৮) এবং কামাল দু’জনেই বর্তমানে পলাতক থাকায় তাদের অনুপস্থিতিতেই বিচার সম্পন্ন হয়।
ভারতে আশ্রয়: গত বছরের ৫ আগস্ট বিক্ষোভ তীব্র হওয়ায় শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন। প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামালও ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন বলে ধারণা করা হয়।
প্রত্যর্পণ দাবি: অন্তর্বর্তী সরকার শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের জন্য ভারতের কাছে আবেদন করেছে, যদিও নয়াদিল্লি এখনো সরাসরি কোনো উত্তর দেয়নি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা বাংলাদেশের সকল অংশীজনের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে যুক্ত থাকবে।
নিরাপত্তা ও অস্থিরতা: রায় ঘোষণার পূর্বে সারাদেশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। সহিংসতা ঠেকাতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ‘দেখামাত্র গুলি’ করার নির্দেশ জারি করেছে। আওয়ামী লীগও এই রায়ের প্রতিবাদে দেশজুড়ে ‘শাটডাউন’ কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল।
এই ঐতিহাসিক রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার জন্য শেখ হাসিনাকে ৩০ দিনের মধ্যে আত্মসমর্পণ অথবা গ্রেফতার হইতে হইবে।



















