ব্যুরো নিউজ ১০ নভেম্বর ২০২৫ : নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (SIR) প্রক্রিয়া ঘিরে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক বিতর্ক চরমে উঠেছে। এর মাঝেই অতিরিক্ত কাজের চাপ এবং এসআইআর-এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের আবহে রাজ্যে দু’টি মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা এই বিতর্ককে আরও তীব্র করে তুলেছে।
কাজ করতে গিয়ে ব্রেন স্ট্রোকে বিএলও-এর মৃত্যু
পূর্ব বর্ধমান জেলার মেমারির চক বলরামপুরের বুথ নম্বর ২৭৮-এর বুথ লেভেল অফিসার (BLO) নমিতা হাঁসদা-র মৃত্যু ঘটেছে। রবিবার পুলিশ এই ঘটনা নিশ্চিত করেছে। পেশায় অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী নমিতাদেবী অতিরিক্ত কাজের চাপেই ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হন বলে পরিবার দাবি করেছে।
- পারিবারিক অভিযোগ: মৃতের স্বামী মাধব হাঁসদা অভিযোগ করেন যে, “প্রতিদিন তাঁকে বলা হচ্ছিল যে আরও বেশি বেশি শুমারি ফর্ম বিতরণ করতে হবে। তিনি এসব নিয়ে খুব মানসিক চাপে ছিলেন। শনিবারও তিনি গভীর রাত পর্যন্ত ফর্ম বিতরণ করছিলেন। কাজ করার সময়ই ব্রেন স্ট্রোক হয়। সেই রাতেই হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।”
- কর্তৃপক্ষের বক্তব্য: এই ঘটনা প্রসঙ্গে পূর্ব বর্ধমানের জেলাশাসক আয়েশা রানি বলেন, “যারা অসুস্থ, তাদের বিএলও ডিউটি থেকে বাদ দেওয়া হয়। আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।”
- ক্ষতিপূরণের দাবি: পোলিং কর্মী ও বিএলও ইউনিটি প্ল্যাটফর্মের সম্পাদক স্বপন মণ্ডল নমিতাদেবীর পরিবারের জন্য ৫০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণের দাবিতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (CEO) দপ্তরে চিঠি লিখেছেন।
অনশনরত দাদার দুশ্চিন্তায় ভাইয়ের প্রাণহানি
এসআইআর-এর বিরোধিতায় ঠাকুরনগরের ঠাকুরবাড়িতে মতুয়াদের জন্য অনশনে বসা দাদা নিতাই মণ্ডলের দুশ্চিন্তায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হলো ভাই প্রফুল্ল মণ্ডলের। পরিবার সূত্রে এমনই দাবি করা হয়েছে।
- ঘটনা: তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতাবালা ঠাকুরের সঙ্গে অনশনে বসা নিতাই মণ্ডল রবিবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁকে বুকে ব্যথা ও ডিহাইড্রেশনের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়। এই খবর বাড়িতে পৌঁছানোর পরই ভাই প্রফুল্ল মণ্ডল হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
- মমতাবালা ঠাকুরের মন্তব্য: তৃণমূল সাংসদ মমতাবালা ঠাকুর নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এসআইআর-এর আতঙ্কে মানুষের মৃত্যু-সহ মতুয়াদের অনশন নিয়ে কমিশনের বিন্দুমাত্র হেলদোল নেই। তিনি অভিযোগ করেন যে, শান্তনু ঠাকুর ও কেন্দ্রীয় সরকার চাইছে মতুয়ারা ধ্বংস হয়ে যাক, আর নির্বাচন কমিশন তা কার্যকর করছে।
- আশঙ্কা: তিনি আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে এসআইআর হলে রাজ্যের প্রায় ২ কোটি মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যেতে পারে, যার মধ্যে ৯৫ শতাংশই মতুয়া হতে পারে।
মুখ্যমন্ত্রীর তীব্র আক্রমণ: ‘২ কোটি নাম বাদ দেওয়ার প্ল্যান’
এই গোটা প্রক্রিয়াটির তীব্র বিরোধিতা করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন যে, “যেন তেন প্রকারে বাংলা থেকে ২ কোটি মানুষের নাম বাদ দেওয়ার প্ল্যান করছে।”
- ডিটেনশন ক্যাম্পের হুঁশিয়ারি: মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “গদিওয়ালারা ভাবছে যেন তেন ভাবে ২ কোটি লোকের নাম বাদ দিয়েই ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়ার কথা।” তিনি দাবি করেন, দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা কারও নেই।
- নোটবন্দির প্রসঙ্গ: তিনি এসআইআর-কে নোটবন্দির সঙ্গে তুলনা করে বলেন, নোটবন্দিতে কোনও কালো টাকা ফেরত আসেনি, বরং ১০০র ওপর লোকের মৃত্যু হয়েছিল লাইনে দাঁড়িয়ে।
- আধার কার্ড নিয়ে প্রশ্ন: তিনি কেন্দ্রকে নিশানা করে বলেন, “যদি আধার কার্ড বানাতে প্রত্যেক ভোটারের কাছ থেকে ১০০০ টাকা করে নিল, তাহলে এখন কেন বলছে আধার কার্ড নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়?” তিনি জনগণকে “দিল্লি থেকে এই সরকারকে সরাতে” আহ্বান জানান।
বিএলও-রা ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ি বাড়ি গিয়ে শুমারি ফর্ম বিতরণ করবেন এবং এর ভিত্তিতে ৯ ডিসেম্বর প্রাথমিক খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশিত হবে।
উপসংহার
রাজ্যের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর তরফ থেকে এসআইআর প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে যে তীব্র আশঙ্কা ও অভিযোগ উঠেছে, তার বিশ্লেষণ নিম্নলিখিত তথ্যের মাধ্যমে সামনে আসছে:
- বিশাল সংখ্যক নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা: রাজ্যে মৃত ভোটার ইতিমধ্যেই ১ কোটি চিহ্নিত হয়েছে। এরপরে ডাবল এন্ট্রি (Double Entry) এবং অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যাও অনুমান করা হচ্ছে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ লাখ। ফলস্বরূপ, এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়া শেষ হলে রাজ্য থেকে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার সম্ভাবনা প্রায় পৌনে দুই থেকে ২ কোটি নাম।
- মুখ্যমন্ত্রীর অনুমানের যৌক্তিকতা: স্বাভাবিকভাবেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়ার অনুমান করছেন—তার ভিত্তি এই পরিসংখ্যান। তবে, তাঁর প্রধান চিন্তা নিজের ভোটব্যাঙ্ক নিয়ে, কারণ নির্বাচন কমিশনের এই প্রক্রিয়াটি গোটা ভারত জুড়েই চলছে।
- রাজনৈতিককরণের চাপ: তবে, পশ্চিমবঙ্গে এই এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়াটির রাজনৈতিককরণের কারণে সরকারি বুথ কর্মী থেকে সাধারণ মানুষ প্রবল চাপের মধ্যে আছেন।
- জনগণের পাশে থাকার অভাব: নাগরিকত্ব নিয়ে যখন এইরকম রাজনৈতিক তরজা চলছে, তখন সাধারণ মানুষের পাশে থাকার পরিবর্তে, বুথে বুথে দলীয় ক্যাম্প বসিয়ে রাজনৈতিকরণ চলছে ।



















