ব্যুরো নিউজ, ২৫ জানুয়ারি ২০২৫ : ভারতের ৭৭তম প্রজাতন্ত্র দিবস সমাগত। দিল্লির কর্তব্য পথে এখন শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি তুঙ্গে। হাজার হাজার সাধারণ মানুষ এবং আমন্ত্রিত অতিথিদের উপস্থিতিতে এ বছর ভারতের সামরিক সক্ষমতা এবং বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক মহোৎসব উদযাপিত হতে চলেছে।
এ বছরের মূল ভাবনা ও আকর্ষণ
২০২৬ সালের কুচকাওয়াজের মূল থিম বা প্রতিপাদ্য হলো ‘বন্দেমাতরম্-এর ১৫০ বছর’। ট্যাবলোর মাধ্যমে দুটি প্রধান বার্তাকে তুলে ধরা হবে— ‘স্বতন্ত্রতা কা মন্ত্র: বন্দেমাতরম্’ এবং ‘সমৃদ্ধি কা মন্ত্র: আত্মনির্ভর ভারত’। প্রথা মেনে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু একটি রাজকীয় বগিতে চড়ে কর্তব্য পথে পৌঁছাবেন এবং সশস্ত্র বাহিনী, আধাসামরিক বাহিনী, এনসিসি (NCC) ও এনএসএস (NSS)-এর কুচকাওয়াজে অভিবাদন গ্রহণ করবেন।
সামরিক শক্তির আস্ফালন ও আকাশপথের মহড়া
এ বছর ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রথমবারের মতো তাদের ‘ব্যাটল অ্যারে ফরম্যাট’ (Battle Array Format) প্রদর্শন করবে, যা ভারতের কৌশলগত শক্তির পরিচয় দেবে। কুচকাওয়াজে সেনাবাহিনীর সাতটি মার্চিং কন্টিনজেন্ট এবং একটি পশু কন্টিনজেন্ট অংশ নেবে। আকাশপথে রোমাঞ্চ ছড়াতে থাকছে ২৯টি বিমান, যার মধ্যে রাফাল (Rafale), সুখোই-৩০ (Su-30), মিগ-২৯ (MiG-29), অ্যাপাচে (Apache) এবং সি-২৯৫ (C-295) বিমানের কসরত দর্শকদের মুগ্ধ করবে।
ট্যাবলোর বৈচিত্র্য ও অংশগ্রহণকারী রাজ্যসমূহ
এ বছর মোট ৩০টি ট্যাবলো কর্তব্য পথে প্রদর্শিত হবে। এর মধ্যে ১৭টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল এবং ১৩টি কেন্দ্রীয় মন্ত্রক ও বিভাগের ট্যাবলো রয়েছে। প্রায় ২,৫০০ শিল্পী তাদের সাংস্কৃতিক পারফরম্যান্সের মাধ্যমে ভারতের বৈচিত্র্যকে তুলে ধরবেন।
অংশগ্রহণকারী রাজ্যসমূহ: অসম, ছত্তিশগড়, গুজরাট, হিমাচল প্রদেশ, জম্মু ও কাশ্মীর, কেরালা, মহারাষ্ট্র, মণিপুর, নাগাল্যান্ড, ওড়িশা, পুদুচেরি, রাজস্থান, তামিলনাড়ু, উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, মধ্যপ্রদেশ এবং পাঞ্জাব।
অনুপস্থিত রাজ্যসমূহ: অরুণাচল প্রদেশ, মিজোরাম, ত্রিপুরা, সিকিম, মেঘালয়, ঝাড়খণ্ড, গোয়া, দিল্লি, কর্ণাটক, তেলেঙ্গানা এবং অন্ধ্রপ্রদেশ এ বছরের কুচকাওয়াজে জায়গা পায়নি। বিশেষ করে দিল্লি, যারা গত ২০ বছরে সাতবার অংশগ্রহণ করেছে, তারা এ বছর বাদ পড়েছে।
ট্যাবলোর নির্বাচন প্রক্রিয়া: পর্দার পেছনের কড়াকড়ি
প্রজাতন্ত্র দিবসের ট্যাবলো নির্বাচন করার প্রক্রিয়া অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক এবং জটিল। প্রতিরক্ষা মন্ত্রক একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে, যেখানে শিল্প, সংস্কৃতি, স্থাপত্য, সংগীত এবং কোরিওগ্রাফি জগতের দিকপালরা থাকেন।
১. নির্বাচনের পর্যায়: প্রায় ৬ থেকে ৭ রাউন্ড আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত তালিকা তৈরি হয়। শুরুতে স্কেচ বা নকশা জমা দিতে হয়, এরপর সেটির থ্রি-ডি (3D) মডেল তৈরি করে কমিটির সামনে পেশ করতে হয়।
২. প্রযুক্তি ও উপাদানের ব্যবহার: এ বছর আধুনিক প্রযুক্তির ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। রোবোটিক্স, মেকাট্রনিক্স, এলইডি লাইটিং এবং থ্রি-ডি প্রিন্টিং-এর ব্যবহার আবশ্যিক করা হয়েছে। পরিবেশ রক্ষায় প্লাস্টিক বর্জন করে ইকো-ফ্রেন্ডলি উপাদান ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
৩. শিল্প ও সংস্কৃতি: যদি কোনো ট্যাবলোতে নাচ থাকে, তবে তা অবশ্যই খাঁটি লোকনৃত্য হতে হবে। পোশাক ও বাদ্যযন্ত্রেও যেন ঐতিহ্যের ছোঁয়া থাকে, তা নিশ্চিত করে বিশেষজ্ঞ কমিটি।
৪. ভাষার নিয়ম: ট্যাবলোর সামনে হিন্দিতে, পেছনে ইংরেজিতে এবং দুই পাশে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের আঞ্চলিক ভাষায় নাম লেখা বাধ্যতামূলক।
Netaji Subhas Chandra Bose Parakram Divas 2026 : পরাক্রম দিবসে নেতাজিকে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা: “নেতাজির নির্ভীক নেতৃত্ব ও অদম্য দেশপ্রেমে শক্তিশালী ভারতের প্রেরণা”
কুচকাওয়াজে মন্ত্রক ও বিভাগের ভূমিকা
প্রতিরক্ষা মন্ত্রক ছাড়াও সংস্কৃতি মন্ত্রক, আয়ুষ মন্ত্রক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক (NDMA-NDRF), বিদ্যুৎ মন্ত্রক এবং দক্ষতা উন্নয়ন মন্ত্রকের মতো ১৩টি বিভাগ তাদের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড প্রদর্শন করবে। ভারতের আত্মনির্ভর হয়ে ওঠার গল্পই ফুটে উঠবে এই বিভাগীয় ট্যাবলোর মাধ্যমে।
প্রজাতন্ত্র দিবসের এই কুচকাওয়াজ কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি ভারতের গণতান্ত্রিক শক্তি এবং সংহতির প্রতীক। আগামী ২৬শে জানুয়ারি দেশবাসী পুনরায় সাক্ষী হতে চলেছে এক অবিস্মরণীয় ইতিহাসের।




















