ব্যুরো নিউজ, ১৯শে নভেম্বর ২০২৫ : জন সুরাজ পার্টির (JSP) প্রতিষ্ঠাতা প্রশান্ত কিশোর মঙ্গলবার প্রকাশ্যে বিহার বিধানসভা নির্বাচনে তাদের সম্পূর্ণ ব্যর্থতা স্বীকার করে নিয়েছেন। এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি বলেন যে জনগণ তাদের উপর আস্থা রাখেননি এবং তিনি এই পরাজয়ের “১০০% দায়িত্ব” গ্রহণ করছেন। তিনি স্বীকার করেন যে, পদ্ধতিগত পরিবর্তন তো দূরের কথা, তার দল ক্ষমতায়ও কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি।
ব্যর্থতার কারণ ও দায়ভার
সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জেএসপি-র প্রতিষ্ঠাতা বলেন, “আমরা সৎ চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু তা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। এটা স্বীকার করতে কোনো ক্ষতি নাই। পদ্ধতিগত পরিবর্তন ছাড়ুন— আমরা ক্ষমতায়ও পরিবর্তন আনতে পারিনি। তবুও, আমরা বিহারের রাজনীতিতে কিছুটা ভূমিকা রেখেছিলাম। আমাদের চেষ্টায়, চিন্তাভাবনায় বা যোগাযোগের পদ্ধতিতে নিশ্চয়ই ভুল ছিল, যেই কারণে জনগণ আমাদের নির্বাচন করেননি। যদি জনতা আমাদের উপর আস্থা না রাখে, তবে তার সম্পূর্ণ দায়িত্ব আমার। বিহারের জনগণের বিশ্বাস অর্জনে ব্যর্থতার ১০০% দায় আমি গ্রহণ করছি।”
নির্বাচনী প্রচারে নিজের বার্তা ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে না পারার ব্যর্থতাও তিনি মেনে নেন। তিনি বলেন, “নতুন পদ্ধতির জন্য কেন ভোট দেওয়া উচিত, তা আমি বিহারের মানুষকে বোঝাতে পারিনি।”
আগামী তিন বছরে তিনি যে পরিশ্রম করেছেন, তার ‘দ্বিগুণ কঠিন পরিশ্রম’ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং বিহারের উন্নতি সাধনের লক্ষ্য থেকে ‘পিছিয়ে যাওয়ার প্রশ্নই নাই’ বলে জানান। দলের ত্রুটির জন্য তিনি ২০ নভেম্বর গান্ধী ভিটিহরওয়া আশ্রমে দিনব্যাপী নীরব উপবাস বা ‘প্রায়শ্চিত্ত’ পালনেরও ঘোষণা করেছেন।
Bihar : বিহার নির্বাচনে ঐতিহাসিক রায়! উন্নয়নের পক্ষে ভোট, মোদীর প্রতিশ্রুতিতে মহিলা ও যুবশক্তির জয়
বিভেদ ও ভোট কেনার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান
সাবেক এই রাজনৈতিক কৌশলবিদ তার বিরুদ্ধে বিভেদ সৃষ্টিকারী রাজনীতি করার অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, তিনি “জাতিভিত্তিক বিষ ছড়াই নাই, হিন্দু-মুসলিম রাজনীতি করি নাই, ধর্মের নামে মানুষকে বিভক্ত করি নাই।”
ঘুষ বা ভোট কেনার অভিযোগও তিনি দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, তারা “ভোট কেনার জন্য বিহারের দরিদ্র, নিরীহ মানুষকে অর্থ দেওয়ার অপরাধ” করেননি।
পদত্যাগের প্রশ্ন নাই
পদত্যাগের প্রশ্নে প্রশান্ত কিশোর স্পষ্ট করেন যে, যেহেতু তিনি কোনো আনুষ্ঠানিক পদ ধারণ করেন না, তাই পদত্যাগের কোনো প্রশ্নই আসে না। তিনি আরও বলেন, তিনি কেবল এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে যদি জেডিইউ ২৫টির বেশি আসন পায়, তবে তিনি রাজনীতি থেকে ‘অবসর’ নেবেন, বিহার ছেড়ে যাবেন না। তিনি রাজনীতি ছাড়লেও বিহারের মানুষের জন্য কথা বলা বন্ধ করবেন না।
তার দল রাজ্যের ২৪৩টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ২৩৮টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল, কিন্তু একটিতেও জয়লাভ করতে পারেনি।
বিপরীত চিত্র: পশ্চিমবঙ্গে প্রশান্ত কিশোরের সংস্থা আইপ্যাক-এর সাফল্য
প্রশান্ত কিশোর যদিও নিজের জন্মভূমিতে সম্মুখ রাজনৈতিক সমরে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ, তবে তার সংস্থা আইপ্যাক (IPAC) পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ভোট কৌশল ও ‘কৌশলী’ প্রকল্পের মাধ্যমে সফল বলে প্রকাশিত হয়েছে।
লক্ষ্মীর ভান্ডার (Lokkhi Bhandar) প্রকল্প: বিহারে নীতীশ কুমার সরকারের মহিলা জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের আদলে ২০২১ সালে রাজ্যে উদ্দীয়মান বিজেপি-কে ঠেকানোর জন্য এই প্রকল্পটি আনা হয়। এটি মহিলাদের একটি মাসিক ভাতার মাধ্যমে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের প্রতি আনুগত্য নিশ্চিত করে থাকে। মহিলাদের এই আনুগত্য ধরে রাখার জন্য প্রতিটি নির্বাচনের পূর্বে ‘লক্ষ্মীর ভান্ডারের’ অঙ্ক সামান্য পরিবর্তন করা হয়।
কৌশলী প্রচার: এছাড়াও প্রশান্ত কিশোরের সংস্থা ‘দিদিকে বলো’, ‘আমার পাড়া আমার সমাধান’, ‘ভোটাধিকার রক্ষা কেন্দ্র’ নামক কয়েকটি রাজনৈতিক কৌশলমূলক প্রকল্প তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে পরিচালনা করে থাকে।
জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি: তৃণমূল কংগ্রেসের সমর্থনে আইপ্যাক-এর কর্মীরা বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পকে সরাসরি সাধারণ মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় করার প্রয়াস চালিয়ে যায়।
পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন যে, যদিও এই প্রকল্পগুলি নির্বাচনের পরে অর্থের অভাবে ভোগে বা প্রতিশ্রুতির অনুরূপ পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয় না, তবুও প্রশান্ত কিশোর নিজে সম্মুখ রাজনীতিতে হয়তো জয়ী হতে পারবেন না, কিন্তু কৌশল ও ‘ছল চাতুরী’ দ্বারা তার সংস্থা আইপ্যাক পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সাফল্য লাভ করেছে।



















