ব্যুরো নিউজ, ২০শে নভেম্বর ২০২৫ : বিহারের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা নীতীশ কুমার বৃহস্পতিবার রেকর্ড দশম বারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ লইয়া আবারও ক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরিয়া আসিলেন। এই শপথগ্রহণের মাধ্যমে তিনি সেই সমালোচকদের নীরব করিয়া দিলেন যাহারা তাঁহার রাজ্য শাসন করিবার ক্ষমতা লইয়া প্রশ্ন তুলিয়াছিলেন।
নির্বাচনের আগে তাঁহার চমৎকার কৌশল, জোরালো প্রচার এবং এই অভূতপূর্ব নির্বাচনী ফল— আবারও প্রমাণ করিয়া দিল যে ভারতের অন্যতম অনিশ্চিত এই রাজনৈতিক অঙ্গনেও মানাইয়া লওয়ার, দীর্ঘায়ু হইবার এবং প্রভাব ধরিয়া রাখিবার ক্ষমতা তাঁহার আছে।
‘সুশাসন বাবু’র দুই দশকের প্রভাব
বিগত দুই দশক ধরিয়া নীতীশ কুমার বিহারের রাজনীতির কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব। মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে তিনি বিহারের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোকে গভীরভাবে প্রভাবিত করিয়া ‘সুশাসন বাবু’ উপাধি অর্জন করিয়াছেন।
রাম মনোহর লোহিয়ার সমাজতান্ত্রিক ধারণা, কর্পূরী ঠাকুরের অভিভাবকত্ব এবং জয়প্রকাশ নারায়ণের ১৯৭৪ হইতে ১৯৭৭ সালের গণ-আন্দোলন— এইগুলিই তাঁহার পাঁচ দশকের রাজনৈতিক জীবনকে গঠন করিয়াছে। একজন তরুণ কর্মী হইতে রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা হইবার পথে এই আদর্শগুলিই ছিল তাঁহার পাথেয়।
রাজনৈতিক উত্থান ও জাতিগত সমীকরণ
১৯৮৫ সালে হারনৌত বিধানসভা আসন হইতে জয়ী হইয়া নীতীশ কুমার নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং ১৯৮৯ সালের মধ্যে লোকসভার সাংসদ হিসাবে জাতীয় মঞ্চে পৌঁছান। পরবর্তীকালে তিনি লোকসভায় নির্বাচিত হন এবং রেল, সড়ক পরিবহন ও কৃষি মন্ত্রকের মতো গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর দায়িত্ব সামলাইয়াছেন।
এই সময়কালে লালু প্রসাদ যাদব পিছিয়ে পড়া জাতিগুলির শক্তিশালী সমর্থন লইয়া বিহারে প্রভাব বিস্তার করিয়াছিলেন। যখন দুর্নীতির অভিযোগ লালুর ভোটব্যাঙ্ককে ক্ষয় করিতে শুরু করে, তখন ইঞ্জিনিয়ার হইতে রাজনীতিবিদ হওয়া নীতীশ কুমার বিহারের রাজনীতিতে উত্থানের সুযোগটি অনুধাবন করেন।
তিনি ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়া জাতিগুলিকে, বিশেষত কুরমি-কুশওয়াহা সম্প্রদায়কে এবং অত্যন্ত পিছিয়ে পড়া শ্রেণী (EBC)-কেও নিজের দিকে আকৃষ্ট করিতে শুরু করেন। এই জাতিগত সমীকরণকে কাজে লাগাইয়া তিনি লালু প্রসাদের প্রতি যাদব সম্প্রদায়ের ঐক্যের মোকাবিলা করেন।
২০০০ সালে তিনি প্রথম বারের মতো বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হন, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভাবে সেই মেয়াদ মাত্র সাত দিন টিকিয়াছিল।
২০০৫ সালে জেডি(ইউ)-বিজেপি জোট স্পষ্ট ম্যান্ডেট পাইলে তাঁহার আসল সাফল্য আসে। তিনি মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ইবিসি (যাহারা জনসংখ্যার প্রায় ৩৬ শতাংশ), মহিলা এবং পসমন্দা মুসলিমদের জন্য কল্যাণ ও সংরক্ষণমূলক ব্যবস্থা জোরদার করিয়া তিনি তাঁহার সমর্থন ভিত্তি মজবুত করেন।
ইহার প্রভাব ২০১০ সালের নির্বাচনে স্পষ্টভাবে দেখা যায়, যখন নীতীশ কুমার ভূমিধস জয় পান। জেডি(ইউ) এবং বিজেপি জোট ২৪৩টি আসনের মধ্যে ২০৬টি আসন জয় করে এবং এনডিএ-র ভোট শতাংশ প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছে যায়। তাঁহার দ্বিতীয় পূর্ণ মেয়াদে (২০১০-১৫) তিনি ‘সুশাসন বাবু’ ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন।
কৌশলগত নমনীয়তা
পরবর্তী বছরগুলি নীতীশ কুমারের অসাধারণ রাজনৈতিক বিচক্ষণতা প্রমাণ করে। তিনি ২০১৩ সালে বিজেপি-র নেতৃত্বাধীন জোট হইতে বাহির হইয়া যান, ২০১৫ সালে লালু প্রসাদের সহিত হাত মিলাইয়া শক্তিশালী মহাজোট গড়েন, এবং দুই বছর পর আবার বিজেপি-তে ফিরিয়া যান। গত পাঁচ বছরে একই রকম রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস চলিয়াছে, কিন্তু প্রতিবারই তিনি মুখ্যমন্ত্রী পদটি ধরিয়া রাখিতে সফল হইয়াছেন। প্রতিদ্বন্দ্বীরা তাঁহাকে বিদ্রূপ করিয়া ‘পল্টু রাম’ বলিলেও, তাঁহার সমর্থকেরা তাঁহার সুশাসনের রেকর্ডের জন্য তাঁহাকে ‘সুশাসন বাবু’ হিসাবে প্রশংসা করেন।
ভারতের দীর্ঘতম মেয়াদী মুখ্যমন্ত্রীদের তালিকায় নীতীশ
বৃহস্পতিবারের শপথগ্রহণের ফলে ৭৪ বছর বয়স্ক এই নেতা প্রায় ১৯ বছর ধরিয়া এই পদে থাকিবার গৌরব অর্জন করিলেন। ইহার ফলে তিনি ভারতের দীর্ঘতম মেয়াদী সরকার প্রধানদের তালিকায় স্থান পাইয়াছেন। এই তালিকায় পশ্চিমবঙ্গের জ্যোতি বসু (২৩ বছরের বেশি), সিকিমের পবন কুমার চামলিং (২৫ বছরের বেশি) এবং ওড়িশার নবীন পট্টনায়েকের (২৪ বছরের বেশি) নাম রহিয়াছে।
পাটনার গান্ধী ময়দানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সহ এনডিএ-র শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে বিহারের জোট-রাজনীতিতে কুমার এখনও কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করিতেছেন।



















