ব্যুরো নিউজ, ২৯শে জানুয়ারী ২০২৬ : সাধারণত আমরা যখন ভালোবাসার কথা ভাবি, তখন আমাদের চোখে ভেসে ওঠে আবেগ, অধিকারবোধ এবং একে অপরকে আঁকড়ে ধরার এক তীব্র বাসনা। কিন্তু শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা আমাদের এক সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতের সন্ধান দেয়। গীতা শেখায়, প্রেম যখন আসক্তিহীন হয়, তখনই তা প্রকৃত শক্তি লাভ করে।
ধর্ম কী? হৃদয়ের ডাক বনাম আত্মার কর্তব্য
‘ধর্ম’ শব্দটির অর্থ কেবল কোনো আচার-অনুষ্ঠান নয়; এটি আমাদের অন্তরের সত্য পথ বা আত্মার স্বধর্ম। জীবনের কোনো এক মোড়ে দাঁড়িয়ে যখন আমাদের আবেগ একদিকে টানে আর কর্তব্য বা ধর্ম অন্যদিকে, তখনই শুরু হয় আসল সংগ্রাম। ভালোবাসা যখন বলে ‘থেমে যাও’, আর ধর্ম যখন বলে ‘এগিয়ে চলো’, সেই মুহূর্তেই আমাদের আধ্যাত্মিক পরীক্ষা শুরু হয়।
Bhagavad Gita : সত্ত্ব, রজ ও তম: গীতার জীবনদর্শনে অন্তরের ভারসাম্য ও আধ্যাত্মিক উত্তরণ
অর্জুনের বিষাদ ও শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা
কুরুক্ষেত্রের রণপ্রাঙ্গণে অর্জুন যখন তাঁর প্রিয়জনদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে অস্বীকার করলেন, তখন তা ছিল প্রেমের এক মানবিক রূপ। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে মনে করিয়ে দিলেন যে, ব্যক্তিগত মোহ বা আসক্তির বশবর্তী হয়ে নিজের কর্তব্য বা ধর্ম ত্যাগ করা বীরের ধর্ম নয়। কৃষ্ণ শেখালেন, আত্মা অবিনশ্বর। ভালোবাসার দোহাই দিয়ে সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত হওয়া আসলে এক প্রকার দুর্বলতা।
আসক্তিহীন ভালোবাসা: এক অদ্ভুত স্বাধীনতা
অনেকের মনে হতে পারে, আসক্তিহীন ভালোবাসা মানে কি তবে পাথর হয়ে যাওয়া? মোটেও তা নয়। আসক্তিহীনতা বা ‘ডিট্যাচমেন্ট’ মানে হলো কাউকে গভীরভাবে ভালোবাসা, কিন্তু তাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা না করা। এটি আগুনের মতো—যা উষ্ণতা দেয়, কিন্তু যাকে মুঠোর মধ্যে বন্দি করতে গেলে তা ছাই হয়ে যায়। যখন আমরা কাউকে পাওয়ার আশা না করে কেবল ভালোবেসে যাই, তখনই সেই প্রেম পবিত্র ও মহৎ হয়ে ওঠে।
কর্মযোগ ও প্রতিদানহীন প্রেমের শিল্প
গীতার কর্মযোগ আমাদের শেখায় ফলের আশা না করে কর্ম করতে। প্রেমের ক্ষেত্রেও এটি সমানভাবে প্রযোজ্য। আমরা যখন কাউকে ভালোবাসি কারণ ভালোবাসা আমাদের স্বভাব, কোনো কিছু পাওয়ার আশায় নয়—তখন সেই প্রেম একটি লেনদেন না হয়ে বরং একটি উপাসনা বা অর্ঘ্য হয়ে ওঠে। একেই বলা হয় ‘নিষ্কাম প্রেম’।
যখন ধর্ম বলে ‘বিদায় নাও’
কখনো কখনো আমাদের জীবনের এমন পরিস্থিতি আসে যেখানে সম্পর্ক বজায় রাখা আর আত্মার উন্নতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সেই মুহূর্তে সরে আসা মানে প্রেমহীনতা নয়, বরং প্রেমের এক বিবর্তিত রূপ। নিজের শান্তি এবং অপর ব্যক্তির মঙ্গলের জন্য ছেড়ে দেওয়াটাও এক প্রকার বড় ভালোবাসা। ধর্ম আমাদের শেখায় যে, সবসময় ‘হ্যাপি এন্ডিং’ বা মিলনই শেষ কথা নয়, বরং সত্যের পথে চলাই জীবনের মূল লক্ষ্য।
Bhagavad Gita : আমি সেই মানুষটি নই: শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার আলোকে আত্ম-রূপান্তর
দৈনন্দিন জীবনে এই দর্শন চর্চার উপায়
বর্তমানে থাকা: প্রিয়জনের সাথে কাটানো মুহূর্তগুলোকে সম্পূর্ণভাবে উপভোগ করুন, ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা ছাড়া।
সীমানা নির্ধারণ: ভালোবাসা মানে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া নয়, বরং নিজের আত্মসম্মান ও মানসিক শান্তি বজায় রেখে অপরকে শ্রদ্ধা করা।
অনিদ্রা ও পরিবর্তনকে মেনে নেওয়া: পৃথিবী পরিবর্তনশীল। সম্পর্ক বা আবেগ চিরস্থায়ী নাও হতে পারে—এই সত্যটি মেনে নিলে বিচ্ছেদের ভয় কমে যায়।
প্রত্যাশাহীন সেবা: কোনো প্রতিদান ছাড়াই প্রিয়জনের জন্য কিছু করার চেষ্টা করুন।
উপসংহার
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার এই অমূল্য দর্শন আমাদের শেখায় যে, ভালোবাসা কোনো শিকল নয়, বরং এটি আমাদের ডানা দেয়। যখন আমরা আসক্তি ত্যাগ করে ধর্মের পথে চলতে শিখি, তখন আমাদের হৃদয় আরও উদার এবং মন আরও শান্ত হয়। এই পথ কঠিন হতে পারে, কিন্তু এটাই হলো প্রকৃত মুক্তির পথ।




















