ব্যুরো নিউজ, ৬ই জানুয়ারী ২০২৬ : ইরানে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকট ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে উত্তেজনা তুঙ্গে পৌঁছেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিক্ষোভে সহিংস দমনের বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়ার পর, ইরানের নির্বাসিত সাবেক যুবরাজ রেজা পাহলভী তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। অন্যদিকে, ইরান এই হুমকিকে “অবৈধ” আখ্যা দিয়ে জাতিসংঘের দ্বারস্থ হয়েছে।
ট্রাম্পের ‘লকড অ্যান্ড লোড’ হুঁশিয়ারি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে এক বার্তায় ইরান সরকারকে সতর্ক করে বলেছেন, যদি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানো হয় বা তাদের হত্যা করা হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র নীরব থাকবে না। তিনি লিখেছেন, “যদি ইরান শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের হত্যা করে, যা তাদের দীর্ঘদিনের রীতি, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসবে। আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত (Locked and Loaded) এবং যেকোনো পদক্ষেপ নিতে সক্ষম।”
রেজা পাহলভী ও ফারাহ পাহলভীর প্রতিক্রিয়া
ট্রাম্পের এই অবস্থানকে স্বাগত জানিয়েছেন ইরানের সাবেক যুবরাজ রেজা পাহলভী। তিনি এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে লিখেছেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, আপনার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং আমার দেশবাসীর প্রতি সমর্থনের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার এই সতর্কবার্তা ইরানি জনগণকে শক্তি ও সাহস যোগাবে।” পাহলভী আরও বলেন যে, ইরানি জনগণ ৪৬ বছরের “বিশৃঙ্খলা ও সন্ত্রাসের শাসনের” অবসান চায় এবং তারা আমেরিকার সাথে পুনরায় সুসম্পর্ক স্থাপনের স্বপ্ন দেখে।
একই সাথে সাবেক রানী ফারাহ পাহলভী নিরাপত্তা বাহিনীকে জনগণের পক্ষে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, “ইরান একসময় আশা ও অগ্রগতির আলোকবর্তিকা ছিল, এবং তা আবারও ফিরে আসবে। বর্তমান সময়টি ইরানিদের হাত দিয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার সন্ধিক্ষণ।”
জাতিসংঘের উদ্বেগ ও ইরানের পাল্টা পদক্ষেপ
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার ভলকার তুর্ক ইরানি কর্তৃপক্ষকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, নাগরিকদের অভাব-অভিযোগ প্রকাশের সুযোগ দেওয়া সরকারের দায়িত্ব।
এদিকে, ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে জাতিসংঘে ইরানের স্থায়ী প্রতিনিধি আমির সাঈদ ইরাভানি জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের কাছে একটি প্রতিবাদলিপি পাঠিয়েছেন। চিঠিতে তিনি ট্রাম্পের এই হুমকিকে আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের সনদের চরম লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে একে “বেপরোয়া ও উসকানিমূলক” বলে নিন্দা জানান। তেহরান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, যেকোনো বাহ্যিক সামরিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে তারা দৃঢ় ও আনুপাতিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
বিক্ষোভের বর্তমান পরিস্থিতি
ইরানের সংবাদমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, তেহরানসহ কোম, মাশহাদ, হামেদান এবং মারভদাশতের মতো শহরগুলোতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও অর্থনৈতিক স্থবিরতার কারণে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে এ পর্যন্ত অন্তত ৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে এবং বহু মানুষকে আটক করা হয়েছে। লোরদেগান কাউন্টিতে বিক্ষোভকারী ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। লোরিস্তান প্রদেশে বাসিজ আধাসামরিক বাহিনীর এক সদস্য নিহত হয়েছেন বলে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম দাবি করেছে।
২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর ইরানে এটিই সবচেয়ে বড় গণবিক্ষোভ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে এবার বাজার ব্যবসায়ী ও ছাত্রসমাজও যোগ দিয়েছে।



















