ব্যুরো নিউজ, ৭ই জানুয়ারী ২০২৬ : বাংলাদেশে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ১৮ দিনে অন্তত ৬ জন হিন্দু ধর্মাবলম্বীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। মব লিঞ্চিং, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনাগুলো এখন বাংলাদেশের নিত্যনৈমিত্তিক চিত্রে পরিণত হয়েছে।
নওগাঁয় গণপিটুনির ভয়ে পালাত গিয়ে মৃত্যু
সর্বশেষ ঘটনায়, নওগাঁ জেলার মহাদেবপুর এলাকায় চুরির অপবাদে একদল উন্মত্ত জনতা মিঠুন সরকার (২৫) নামে এক যুবককে তাড়া করে। উত্তেজিত জনতার হাত থেকে বাঁচতে মিঠুন পাশের একটি খালে ঝাঁপ দিলে তার মৃত্যু হয়। পুলিশ ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় তার মরদেহ উদ্ধার করেছে এবং ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে।
Bangladesh : পেট্রোল ঢেলে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা: বাংলাদেশে এক মাসে চার হিন্দু নিধন
২৪ ঘণ্টায় দুই হত্যাকাণ্ড: নরসিংদী ও যশোর
সোমবার রাতে নরসিংদী ও যশোরে পৃথক দুটি ঘটনায় দুই হিন্দু ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছে।
নরসিংদী: পলাশ উপজেলার চরসিন্দুর বাজারে ৪৪ বছর বয়সী মুদি দোকানদার শরৎ মণি চক্রবর্তীকে তার দোকানের ভেতরেই ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। মৃত্যুর আগে তিনি ফেসবুকে লিখেছিলেন যে, তার এলাকা “মৃত্যুপুরী”তে পরিণত হয়েছে।
যশোর: মণিরামপুর উপজেলায় সাংবাদিক ও বরফকলের মালিক রানা প্রতাপ বৈরাগীকে মোটরসাইকেলে আসা তিন দুষ্কৃতকারী পরিকল্পিতভাবে গুলি করে হত্যা করে। তাকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে মাথায় গুলি করা হয় এবং পরে গলা কেটে দেওয়া হয়।
ডিসেম্বরের বিভীষিকা: পুড়িয়ে হত্যা ও ব্লাসফেমি ( ঈশ্বর নিন্দা ) গুজব
গত ডিসেম্বর থেকে সহিংসতার মাত্রা চরমে পৌঁছেছে। ৩ জানুয়ারি শরীয়তপুরের খোকন চন্দ্র দাস মারা যান, যাকে ৩১ ডিসেম্বর একদল জনতা কুপিয়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। ২৪ ডিসেম্বর রাজবাড়ীতে অমৃত মন্ডলকে চাঁদাবাজির অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
সবচেয়ে নৃশংস ঘটনাটি ঘটে ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহে। ব্লাসফেমি বা ধর্ম অবমাননার মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে দিপু চন্দ্র দাস নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর তার মরদেহ গাছে ঝুলিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তী তদন্তে জানা গেছে, ব্লাসফেমির অভিযোগটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ছিল।
Bangladesh : সাম্প্রদায়িক কট্টরপন্থার কবলে বাংলাদেশ: দীপু দাসের পর এবার অমৃত মণ্ডলকে পিটিয়ে হত্যা
বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যার পরিসংখ্যান
২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, বাংলাদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা প্রায় ১৩.১৩ মিলিয়ন (১ কোটি ৩১ লক্ষ), যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭.৯৫ শতাংশ। তবে বর্তমান অস্থিরতা ও অব্যাহত হামলার কারণে এই জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা চরম সংকটে।
| সময়কাল | ভুক্তভোগীর নাম | স্থান | হামলার ধরন |
| ১৮ ডিসেম্বর | দিপু চন্দ্র দাস | ময়মনসিংহ | লিঞ্চিং ও পুড়িয়ে মারা |
| ২৪ ডিসেম্বর | অমৃত মন্ডল | রাজবাড়ী | গণপিটুনি |
| ৩১ ডিসেম্বর | খোকন চন্দ্র দাস | শরীয়তপুর | কুপিয়ে আগুন ধরানো |
| ০৬ জানুয়ারি | শরৎ মণি চক্রবর্তী | নরসিংদী | ধারালো অস্ত্রে হত্যা |
| ০৬ জানুয়ারি | রানা প্রতাপ | যশোর | গুলি ও গলা কাটা |
ভারতের উদ্বেগ ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
সংখ্যালঘুদের ওপর এই লাগাতার হামলায় ভারত সরকার গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই পরিস্থিতি বাংলাদেশে বড় ধরনের শরণার্থী সংকটের জন্ম দিতে পারে, যা ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এদিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনকালে এই ধরণের “মব ভায়োলেন্স” রুখতে ব্যর্থতাকে দায়ী করছে। কিন্তু কার্যকারী পদক্ষেপ এই হত্যা যোগ্য থামানোর জন্য কিছুই নিশ্চিন্ত করতে পারেনি ।




















