ব্যুরো নিউজ, ০৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ : মানুষের জীবনে এমন এক ধরণের ক্লান্তি আসে, যা শারীরিক নয়—মানসিক। যখন আপনার মন যা চায়, আপনার বিবেক বা যুক্তি তা অনুমোদন করতে পারে না। এটি কোনো নাটকীয়তা নয়, বরং এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব। আপনি জানেন যে আপনার ‘চাওয়া’টি হয়তো ভুল, কিন্তু আপনার ‘উচিত’ বা সঠিক পথটি বড় বিবর্ণ এবং প্রাণহীন মনে হচ্ছে। ঠিক এই বিন্দু থেকেই শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার শুরু। কুরুক্ষেত্রের ময়দানে অর্জুন কোনো সাধারণ দ্বিধায় পড়েননি; তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন সেই অসহ্য ভারের নিচে, যেখানে যুদ্ধের উভয় পক্ষেই তার নিজের অস্তিত্বের এক একটি অংশ জড়িয়ে ছিল।
যখন ‘সঠিক’ পথটি আর মানানসই মনে হয় না
কখনো কখনো আমরা এমন এক পরিস্থিতিতে পৌঁছাই, যেখানে আমাদের কর্তব্য বা আদর্শগুলো পুরনো জামার মতো ছোট হয়ে আসে। আমরা সেগুলোকে শ্রদ্ধা করি, কিন্তু সেগুলো আর আমাদের বর্তমান অস্তিত্বের সাথে খাপ খায় না। অন্যদিকে, মনের নতুন আকাঙ্ক্ষাগুলোকে মনে হয় বিপজ্জনক বা বেপরোয়া। এই দোটানায় আমরা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি—পেছনে ফেরার পথ নেই, আবার সামনে এগোতেও ভয়।
শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছিলেন, “কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন।” এর একটি গূঢ় অর্থ হলো: যখন আপনি নিশ্চিত নন, তখনও আপনাকে কর্ম করতে হবে। আনন্দ বা নিরাপত্তার আশায় নয়, বরং এই কারণে যে—ভিতরটা কাঁপতে থাকলেও এই কর্মটি সম্পন্ন করা আপনার বিবর্তনের জন্য প্রয়োজন।
Bhagavad Gita : গীতার আলোকে জীবন দর্শন: নরকের তিন দ্বার থেকে মুক্তির পথ
হৃদয়ের ডাক এবং কর্মফলের উত্তর
আমরা প্রায়ই হৃদয়কে একজন ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে দেখি যে সব জানে। কিন্তু গীতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়: সব ইচ্ছাই দৈব নয়। কিছু আকাঙ্ক্ষা আসলে আমাদের ‘কর্মফলের পুনরাবৃত্তি’ (Karmic Reruns), যা কেবল আমাদের কিছু শিক্ষা দেওয়ার জন্য তৃষ্ণার ছদ্মবেশে আসে। হৃদয়ের কথা শুনে চলা মানেই সবসময় পুরস্কার পাওয়া নয়; অনেক সময় তা আপনাকে এক কঠিন শ্রেণীকক্ষে নিয়ে দাঁড় করায়। আপনি যখন আবেগের বশবর্তী হয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেন, প্রকৃতি আপনাকে শাস্তি দেয় না, বরং আপনাকে শিক্ষিত করে তোলে।
মরীচিকার অবসানই প্রকৃত মুক্তি
বহু বছর ধরে যা তাড়া করে বেরিয়েছেন, তা হাতে পাওয়ার পর যদি দেখেন তা অন্তঃসারশূন্য, তবে ভেঙে পড়বেন না। এটি বিশ্বাসঘাতকতা নয়, এটি হলো ‘প্রকাশ’ (Revelation)। আপনি ভুল পছন্দ করেননি, বরং সত্যকে চেনার জন্য ওই ভুল পথটুকু পেরোনো আপনার জন্য অপরিহার্য ছিল। অনেক সময় কোনো ভ্রম বা মরীচিকা ছাড়া সত্যের কাছে পৌঁছানো যায় না। শ্রীকৃষ্ণের দর্শনে—বিভ্রমকে অভিশাপ দেবেন না, কারণ এই বিভ্রমই আপনাকে জাগিয়ে তোলে। যা আপনার হওয়ার ছিল না, তা বোঝার জন্য তা একবার পেয়ে দেখা জরুরি।
Bhagavad Gita : পথ হারানো পথিকের ঠিকানা: গীতার আলোকে আত্ম-অনুসন্ধান
সঠিক পথে চলার একাকীত্ব ও শান্তি
এমন দিন আসবে যখন আপনি নীতি মেনে চলবেন, আদর্শ বিসর্জন দেবেন না, কিন্তু আপনার মন কষ্টে নীল হয়ে থাকবে। আপনি ভাববেন, “যদি সঠিক কাজই করলাম, তবে এত শূন্যতা কেন?” মনে রাখবেন, নীতি বা ধর্ম পালন করা সবসময় তৃপ্তিদায়ক হয় না; অনেক সময় তা অত্যন্ত একাকীত্বের।
কৃষ্ণ অর্জুনকে শিখিয়েছিলেন, শান্তি প্রাপ্তি থেকে আসে না, আসে অর্পণ থেকে। সঠিক কাজ করতে গিয়ে যদি চোখের জল পড়ে, তবে তাকে পড়তে দিন। সেই অশ্রু আপনার দুর্বলতা নয়, বরং প্রমাণ যে আপনি একজন মানুষ হয়েও দিব্য কর্ম পালন করছেন। আত্মা শান্তির পরিমাপ আনন্দ দিয়ে করে না, করে সততা বা ‘ইন্টিগ্রিটি’ দিয়ে।
উপসংহার: চাওয়া ও পাওয়ার মাঝখানের স্থিরবিন্দু
সত্যি বলতে, হৃদয় আর কর্তব্যের লড়াইয়ে সবসময় কেউ একজন জেতে না। মাঝে মাঝে দুজনেই সঠিক হয় এবং দুজনেই কষ্ট দেয়। গীতার শ্রেষ্ঠ প্রজ্ঞা এটাই—কোনো একটাকে বেছে নেওয়া নয়, বরং নিজের ভেতরে এতটাই স্থির হওয়া যাতে আপনি বুঝতে পারেন কোনটি ভয় থেকে আসছে আর কোনটি ভালোবাসা থেকে। আপনার ইচ্ছা বদলাতে পারে, ‘সঠিক’ এর সংজ্ঞাও সময়ের সাথে বিবর্তিত হতে পারে। কিন্তু আপনার ‘স্বত্বা’ বা ‘self’, যা এই চাওয়া আর পাওয়ার লড়াইকে দেখছে, সে অপরিবর্তনীয়। যখন কোনো পথ খুঁজে পাবেন না, তখন কেবল নিজের সচেতনতাকে বেছে নিন। এটি হয়তো যন্ত্রণা কমাবে না, কিন্তু যন্ত্রণাকে অর্থবহ করে তুলবে।



















