ব্যুরো নিউজ, ১৭ই নভেম্বর ২০২৫ : দিল্লি রেড ফোর্ট বিস্ফোরণ মামলার তদন্তে এটি নিশ্চিত হলো যে, বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হওয়া Hyundai i20 গাড়িটির চালক ছিলেন ডঃ উমর উন নবি। অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস (AIIMS)-এর ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে উমরের মায়ের ডিএনএ-এর সঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া হাড় ও দাঁতের অংশের ডিএনএ শতভাগ মিলে যাওয়ায় এই বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে।
ডঃ উমর নবি আল-ফালাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনারেল মেডিসিন বিভাগের একজন সহকারী অধ্যাপক ছিলেন। তদন্তকারীরা নিশ্চিত করেছেন যে, বিস্ফোরণের সময় উমর গাড়িতে একাই ছিলেন এবং তিনিই বিস্ফোরক বোঝাই গাড়িটি চালাচ্ছিলেন।
বোমা তৈরির প্রক্রিয়া ও ষড়যন্ত্রের বিবরণ
ফরেনসিক দল নিশ্চিত করেছে যে, উমর মোহাম্মদই এই বোমা তৈরির মূল কারিগর।
বিস্ফোরক: তিনি সাধারণ কয়লা খনি থেকে সহজে সংগ্রহযোগ্য ডিটোনেটর ব্যবহার করে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট, ফুয়েল অয়েল এবং ট্রান্সফরমার অয়েল মিশিয়ে একটি শক্তিশালী বিস্ফোরক তৈরি করেছিলেন।
ট্র্যাক্টিকস: বোমাটি পাতলা তারের মাধ্যমে ৩ মিমি বা ৯ মিমি ব্যাটারির টাইমিং ডিভাইসের সাথে যুক্ত করা ছিল। এই সার্কিটটি চালু করার জন্য একটি ম্যানুয়াল সুইচ ছিল, যা উমর একটি সাধারণ অন-অফ সুইচের মতো ব্যবহার করেছিলেন বলে মনে করা হচ্ছে। বোমাটি তৈরি করতে মাত্র পাঁচ থেকে দশ মিনিট সময় লাগে।
গাড়ির সূত্র: হামলায় ব্যবহৃত সাদা i20 গাড়িটি ২ লক্ষ টাকায় ফরিদাবাদের এক ডিলারের কাছ থেকে নগদ টাকায় কেনা হয়। ডকুমেন্টেশন হিসেবে একটি জম্মু ও কাশ্মীরি ড্রাইভিং লাইসেন্স জমা দেওয়া হয়েছিল। ফরেনসিক বিশ্লেষণে জানা যায়, i20 গাড়িসংক্রান্ত ৬০ শতাংশ তথ্য বিস্ফোরণের রহস্য উন্মোচনে সাহায্য করেছে।
তদন্তকারী সংস্থাগুলি এখন এই বিষয়ে মনোযোগ দিচ্ছে যে, ডঃ উমর নবি গাড়িতে বোমাটি কখন তৈরি এবং টাইমার ও ওয়্যারিং যুক্ত করেছিলেন— এটি কি লালকেল্লার পার্কিং এলাকায় তিন ঘণ্টা পার্ক করা থাকার সময়, নাকি দিল্লিতে প্রবেশ করার আগেই?
এনআইএ-র তদন্ত ও জইশ-ই-মহম্মদের সংযোগ
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক (MHA) এই মামলার তদন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (NIA)-এর হাতে তুলে দিয়েছে। এনআইএ-র তদন্তে এই হামলাটিকে জইশ-ই-মহম্মদ (JeM) মডিউল দ্বারা পরিচালিত সন্ত্রাসবাদী হামলা বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
গ্রেফতার: এনআইএ কাশ্মীরি বাসিন্দা আমির রশিদ আলিকে দিল্লি থেকে গ্রেফতার করেছে। ইনি আত্মঘাতী বোমারু উমর উন নবির সঙ্গে ভেহিকল-বোর্ন আইইডি (VBIED) হামলায় ষড়যন্ত্র করেছিলেন।
হোয়াইট কলার মডিউল: জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশ একটি অত্যন্ত পরিমার্জিত ‘হোয়াইট কলার’ সন্ত্রাস মডিউল উন্মোচন করেছে, যেখানে ডাক্তারসহ উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিরা জড়িত ছিলেন। উমর নবি ছিলেন এই ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রে।
বিদেশের যোগ: তদন্তে জানা যায়, উমর নবি এবং সহ-অভিযুক্ত ডঃ মুজাম্মিল গনাই ২০২১ সালে তুরস্কে ভ্রমণ করেছিলেন, যেখানে তাঁরা সম্ভবত জেএম অপারেটিভদের সঙ্গে দেখা করে উগ্রপন্থায় দীক্ষিত হন।
অন্যান্য পরিকল্পনা: অভিযুক্তরা প্রথমে এই বছর ২৬শে জানুয়ারি লালকেল্লায় হামলা করার পরিকল্পনা করেছিল এবং তারা এর জন্য রেকিও করেছিল।
জম্মু ও কাশ্মীর রাজনীতিতে প্রতিক্রিয়া ও বিতর্ক
হামলার পর দক্ষিণ কাশ্মীরের পুলওয়ামায় ডঃ উমর নবির বাড়ি কর্তৃপক্ষ ভেঙে দিয়েছে। এই কঠোর পদক্ষেপের বিরুদ্ধে জম্মু ও কাশ্মীর ন্যাশনাল কনফারেন্স দলের নেতা ডঃ ওমর আব্দুল্লাহ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
ওমর আব্দুল্লাহর বক্তব্য হলো, সরকার পুলওয়ামা বিস্ফোরণের পর থেকে সন্ত্রাসীদের বাড়ি ভেঙে আসছে, কিন্তু এতে সন্ত্রাস কমেনি বরং অসন্তোষ বেড়েছে। যদিও পুরো ভারত সাধারণত এই ধরনের সন্ত্রাসবাদের সমর্থক যেকোনো গোষ্ঠীর সম্পূর্ণ নির্মূল চায়, তবে এই ধরনের পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে উপত্যকার রাজনীতিতে বিভেদ সৃষ্টি হচ্ছে।
উপত্যকার এই পরিস্থিতিকে অনেকে বাধ্যতামূলক জনবিন্যাসের পরিবর্তনের ফল বলে মনে করেন। কাশ্মীর উপত্যকা মূলত কাশ্মীরি পণ্ডিতদের দ্বারা অধ্যুষিত ছিল, যারা ১৩শ শতক থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ইসলামি আক্রমণের কারণে বাধ্য হয়ে স্থানান্তরিত হন বা ধর্ম পরিবর্তন করেন। এই অঞ্চলে এখন এমন সম্প্রদায় এবং সংস্কৃতি বাস করে, যারা ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সর্বদা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তারা ভারতীয় অর্থনীতিতে নির্ভরশীল হওয়া সত্ত্বেও এই অঞ্চলে রাজনৈতিক এবং জনসংখ্যাগত উদ্দেশ্য থাকার কারণে শান্তি আসেনি এবং দেশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদী উদ্দেশ্য পোষণ করে। বিশেষ করে যখন স্থানীয় রাজনীতিবিদরা এই ধরনের দেশবিরোধী কার্যকলাপের প্রতি সহানুভূতি দেখান, তখন পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।



















