ব্যুরো নিউজ, ৫ই জানুয়ারী ২০২৬ : বাংলাদেশের শরীয়তপুরে উগ্রবাদী জনতার হাতে নৃশংসভাবে অগ্নিদগ্ধ হওয়া হিন্দু ওষুধ ব্যবসায়ী খোকন দাস চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। শনিবার সকালে ঢাকার বার্ন ইনস্টিটিউটে তার মৃত্যু হয়। এই ঘটনাটি বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের এক ভয়াবহ রূপরেখা তুলে ধরেছে, যা সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এক উদ্বেগজনক প্যাটার্নে পরিণত হয়েছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট: খোকন দাসের মর্মান্তিক পরিণতি
গত ৩১ ডিসেম্বর রাতে বাড়ি ফেরার পথে খোকন দাসের ওপর হামলা চালানো হয়। হামলাকারীরা তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করার পর শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। প্রাণ বাঁচাতে তিনি নিকটস্থ একটি পুকুরে ঝাঁপ দিলেও শরীরের অধিকাংশ অংশ পুড়ে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। নিহতের পরিবার জানিয়েছে, খোকন দাসের কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ছিল না। এই হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে র্যাব কিশোরগঞ্জ থেকে সোহাগ খান, রাব্বি মোল্লা ও পলাশ সরদার নামে তিনজনকে গ্রেফতার করেছে।
ঘটনার বিবরণ: প্রাণ বাঁচাতে পুকুরে ঝাঁপ, তবুও শেষ রক্ষা হলো না
গত মঙ্গলবার (৩১ ডিসেম্বর) রাতে কাজ সেরে বাড়ি ফেরার পথে ডামুড্যার কোনেশ্বর ইউনিয়নের কেয়ুরভাঙ্গা বাজারে খোকন দাসের ওপর একদল হামলাকারী চড়াও হয়। হামলাকারীরা তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করার পর গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। জ্বলন্ত শরীর নিয়ে পাশের একটি পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে সাময়িকভাবে আগুন নেভাতে সক্ষম হলেও, তার শরীরের এক বিশাল অংশ ততক্ষণে পুড়ে যায়। চিকিৎসকরা জানান, শনিবার সকাল ৭টা ২০ মিনিটে তার মৃত্যু হয়।
এক মাসে চার হিন্দু হত্যাকাণ্ড
খোকন দাসের এই মৃত্যু বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। গত এক মাসে বাংলাদেশে এটি চতুর্থ হিন্দু নিধনের ঘটনা:
১৮ ডিসেম্বর: ময়মনসিংহে পোশাক শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যার পর গাছে ঝুলিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
২৪ ডিসেম্বর: রাজবাড়ীতে চাঁদাবাজির মিথ্যা অভিযোগে অমৃত মন্ডল নামে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
৩০ ডিসেম্বর: ময়মনসিংহের ভালুকায় বাজেন্দ্র বিশ্বাস নামে এক আনসার সদস্যকে সহকর্মী গুলি করে হত্যা করে।
Bangladesh Hindu killed : ১০ দিনে ৩ জন: বাংলাদেশে আবারও হিন্দু নিধন?
বিশ্লেষণী পর্যবেক্ষণ: ইউনূস প্রশাসনের ব্যর্থতা ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
খোকন দাসের মৃত্যু এবং গত এক মাসে চারজন হিন্দু হত্যার ঘটনা বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে কিছু কঠোর বাস্তবতা:
কার্যকারিতার অভাব ও অবহেলা: শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রশাসন সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে যে, ইউনূস প্রশাসন সংখ্যালঘু নিপীড়ন বন্ধে কেবল অকার্যকরই নয়, বরং সুরক্ষার প্রশ্নে ইচ্ছাকৃত অবহেলার পরিচয় দিচ্ছে।
আঞ্চলিক মেরুকরণ: পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমান প্রশাসন সংখ্যালঘু ইস্যু এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ভারতের বদলে পাকিস্তানের স্বার্থের অনুকূলে কাজ করছে, যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে আরও বিপন্ন করে তুলেছে।
পশ্চিমা হস্তক্ষেপ ও ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর কুফল: এটি এখন ব্যাপকভাবে স্বীকৃত যে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং ইউনূসকে ক্ষমতায় বসানোর নেপথ্যে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সক্রিয় ভূমিকা ছিল। তবে ইতিহাস সাক্ষী যে—ইরাক, ইউক্রেন কিংবা বাংলাদেশ—যেখানেই পশ্চিমা মদতে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করা হয়েছে, সেখানে শান্তির বদলে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। আর এই প্রতিটি ক্ষেত্রে জাতিগত বা ধর্মীয় সংখ্যালঘুরাই সবচেয়ে বড় শিকারে পরিণত হয়েছে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশে ভারত-বিদ্বেষ এবং সাম্প্রদায়িক সহিংসতার এই ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফ দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে এক গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।



















