ব্যুরো নিউজ, ১লা মার্চ ২০২৬ : ইরানের দীর্ঘ সময়ের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেই (৮৬) আমেরিকা ও ইসরায়েলের এক ভয়াবহ বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন। ১৯৮৯ সাল থেকে দীর্ঘ ৩৭ বছর ইরানের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর তাঁর এই আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো মধ্যপ্রাচ্য বর্তমানে এক চরম অস্থিরতার মুখে দাঁড়িয়ে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছে।
হামলার প্রেক্ষাপট ও খামেনেইর মৃত্যু
২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখে আমেরিকা ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর ‘প্রতিরোধমূলক’ বিমান হামলা শুরু করে। তেহরানে খামেনেইর নিজস্ব কম্পাউন্ড লক্ষ্য করে চালানো এই হামলায় তিনি প্রাণ হারান। উল্লেখ্য যে, ২০২৫ সালের ‘১২ দিনের যুদ্ধ’ এবং পরবর্তী সময়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার জেরে এই অভিযান চালানো হয় বলে হোয়াইট হাউস ও তেল আবিব দাবি করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই হামলার পর সরাসরি ইরানি জনগণকে ক্ষমতা দখলের আহ্বান জানিয়েছেন।
ক্ষমতার উত্থান ও ‘লৌহমানবে’র শাসন
১৯৩৯ সালে মাশহাদে জন্ম নেওয়া খামেনেই ছিলেন আয়াতুল্লাহ খোমেনির একনিষ্ঠ শিষ্য। ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর তাঁর রাজনৈতিক উত্থান শুরু হয়। ১৯৮১ সালে একটি ঘাতক হামলা থেকে বেঁচে গেলেও তাঁর ডান হাতটি চিরতরে অবশ হয়ে যায়। ১৯৮৯ সালে খোমেনির মৃত্যুর পর তিনি সর্বোচ্চ নেতার পদে আসীন হন। যদিও সে সময় তাঁর ধর্মীয় যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল, কিন্তু অত্যন্ত চতুরতার সাথে তিনি শাসনব্যবস্থার ওপর নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন।
অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়ন ও গণবিক্ষোভ
খামেনেইর শাসনকাল ছিল একদিকে যেমন রক্ষণশীল, অন্যদিকে তেমনই কঠোর। তাঁর শাসনামলে একাধিকবার বড় ধরনের গণবিক্ষোভ দেখা দিয়েছে:
১৯৯৯: ছাত্র আন্দোলন।
২০০৯: ‘সবুজ আন্দোলন’ (Green Movement)।
২০২২: মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলন।
২০২৬ (জানুয়ারি): দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে প্রায় ৩০,০০০ মানুষ নিহত হন, যা আধুনিক ইরানের ইতিহাসে রক্তক্ষয়ী অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত।
পররাষ্ট্রনীতি ও ‘প্রতিরোধের অক্ষ’
খামেনেইর নেতৃত্বে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে এক শক্তিশালী ‘অক্ষ’ (Axis of Resistance) গড়ে তুলেছিল। লেবাননের হিজবুল্লাহ, গাজার হামাস, ইয়েমেনের হুথি এবং সিরিয়ার আসাদ সরকারের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন তিনি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েলি হামলায় হিজবুল্লাহ ও হামাস নেতৃত্বের বিপর্যয় এবং ২০২৪ সালে সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতনের ফলে খামেনেইর আঞ্চলিক প্রভাব অনেকটাই সংকুচিত হয়ে এসেছিল।
অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও আদর্শিক লড়াই
খামেনেইর দীর্ঘ শাসনকাল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিটি জনবিক্ষোভ বা আন্দোলনের মুখে তিনি কেবল কঠোর দমন-পীড়ন ও নৃশংসতার উদাহরণই রেখে গেছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে এক মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে:
মুক্ত বিশ্বের দৃষ্টিভঙ্গি: পশ্চিমী দেশগুলো এবং মানবাধিকার কর্মীদের মতে, খামেনেইর এই মৃত্যু ইরানের সাধারণ আন্দোলনকারীদের ওপর হওয়া অমানবিক অত্যাচারের একটি ‘ঐশ্বরিক বিচার’ বা সুবিচার। বিশেষ করে যারা গত কয়েক দশকের বিক্ষোভে প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের পরিবারের কাছে এটি একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
কট্টরপন্থীদের অবস্থান: অন্যদিকে, ইরানের মৌলবাদী ও কট্টরপন্থী শাসকগোষ্ঠী মনে করে, খামেনেইর এই হত্যাকাণ্ড ইরানের সার্বভৌমত্বের ওপর চরম আঘাত এবং পশ্চিমা বিশ্বের অন্যায়ের এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। তাদের মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং ইরানের অস্তিত্বের ওপর সরাসরি আক্রমণ।
এই আদর্শিক সংঘাত ইরানকে এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। কট্টরপন্থী নেতারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাঁরা প্রয়োজনে বহিঃশত্রুর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হতে রাজি, কিন্তু দেশের অভ্যন্তরে আন্দোলনকারীদের গণতান্ত্রিক দাবির কাছে মাথা নত করতে কোনোভাবেই প্রস্তুত নন। ফলে খামেনেই-পরবর্তী ইরানে রক্তক্ষয় থামার সম্ভাবনা এখনই দেখা যাচ্ছে না।
Iran : ট্রাম্পের ‘ধন্যবাদ’ বনাম নেতৃত্ব বদলের ডাক: ইরানের ওপর আমেরিকার দ্বিমুখী কৌশলের নেপথ্যে কী?
উত্তরাধিকার ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
খামেনেইর মৃত্যুতে ইরানে এক গভীর সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। বর্তমানে একটি অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সিল গঠিত হলেও, তাঁর যোগ্য উত্তরাধিকারী কে হবেন তা নিয়ে চরম ধোঁয়াশা রয়েছে। একদিকে যেমন কট্টরপন্থীরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে মরিয়া, অন্যদিকে দেশের তরুণ প্রজন্ম এবং নির্বাসিত বিরোধী নেতারা এক আমূল পরিবর্তনের আশায় প্রহর গুনছেন।


















