শুদ্ধাত্মা মুখার্জি , ২ই মার্চ ২০২৬ : বসন্তের এক বিষণ্ণ সন্ধ্যায় কলকাতা প্রেস ক্লাব সাক্ষী থাকল এক নজিরবিহীন শোকসভার। ‘নিউজ ১৬ বাংলা’-র তরুণ ও নির্ভীক সাংবাদিক অরবিন্দ নায়েকের আকস্মিক ও রহস্যজনক প্রয়াণে শোকস্তব্ধ গোটা বাংলার ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম ও ইউটিউবার গোষ্ঠী। ‘নিউজ নয়া ভারত’-এর কর্ণধার স্বপন দাসের উদ্যোগে আয়োজিত এই স্মরণসভাটি কেবল শোকপ্রকাশের মঞ্চ নয়, বরং পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সাংবাদিকতার কঠিন বাস্তবকে জনসমক্ষে আনার এক প্রতিবাদী ক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল।
উপস্থিত বিশিষ্টজন ও শ্রদ্ধার্ঘ্য
এদিন অকালপ্রয়াত অরবিন্দের প্রতিকৃতিতে মালা দিয়ে শ্রদ্ধা জানান সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ। উপস্থিত ছিলেন সামাজিক মাধ্যমের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, আইনজীবী, চিকিৎসক, হিন্দু সন্ন্যাসী ও সমাজসেবীরা। উল্লেখযোগ্যভাবে উপস্থিত ছিলেন সাংবাদিক পঙ্কজ বিশ্বাস, দীপঙ্কর মহাশয়, ‘দ্য নিউজ বাংলা’-র মানব গুহ,’জাগরণ বাংলা’-র কর্ণধার তথা উপস্থাপক দিবাকর, বিশিষ্ট সমাজসেবী ও হিন্দু সাধু বলরাম বসু, উত্তর কলকাতার সমাজসেবী সুরজ সিং, প্রাক্তন সাংবাদিক কেয়া ঘোষ, আইনজীবী রাহুল দাস, সাধু হরিদাস , চিকিৎসক শান্তনু গাঙ্গুলি এবং হিন্দু সন্ন্যাসী স্বামী তন্ত্রদেবানন্দ মহারাজ । এছাড়াও বহু স্বাধীন চিত্র-সাংবাদিক ও সংবাদকর্মী উপস্থিত হয়ে তাঁদের সহকর্মীর প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন।
অরবিন্দের মৃত্যু: কিছু অনুচ্চারিত প্রশ্ন ও প্রশাসনিক উদাসীনতা
স্মরণসভায় আইনজীবী রাহুল দাস অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর তথ্য পেশ করেন। তিনি জানান, দমদম থানায় অরবিন্দের ‘অস্বাভাবিক মৃত্যু’-র রিপোর্ট জমা পড়েছে। তাঁর দাবি, এই মৃত্যুর পিছনে অন্য কোনো ইউটিউবার বা প্রভাবশালীর যোগসাজশ থাকতে পারে। অরবিন্দের পরিবারকে প্রভাবিত করে এবং তাঁর ওপর চরম মানসিক চাপ সৃষ্টি করে তাঁকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
অন্যদিকে, সমাজসেবী সুরজ সিং সাগরদিঘি হাসপাতালে অরবিন্দের মরদেহ গ্রহণের সময়কার অভিজ্ঞতায় ক্ষোভ উগরে দেন। তাঁর মতে, প্রশাসনের চূড়ান্ত অবহেলা ও অযত্নে একজন নির্ভীক সাংবাদিকের দেহকে যেভাবে ফেলে রাখা হয়েছিল, তা অমানবিক ও লজ্জাজনক।
ডিজিটাল বনাম মূলধারা: বৈষম্যের কঙ্কালসার চিত্র
স্বামী তন্ত্রদেবানন্দ মহারাজ এবং বলরাম বসুর বক্তব্যে সাংবাদিকতার জগতের ‘কৌলীন্য প্রথা’র বিষয়টি উঠে আসে। তাঁরা উল্লেখ করেন, সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত বড় মিডিয়া হাউসগুলো যতটা সুরক্ষিত, স্বাধীন বা ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকরা ততটাই অবহেলিত। অথচ এই স্বাধীন সাংবাদিকরাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সত্য পরিবেশন করেন। প্রাক্তন সাংবাদিক কেয়া ঘোষ এই বৈষম্য ঘোচাতে এবং বিপন্ন ইউটিউব সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়াতে একটি বিশেষ ‘স্মৃতি তহবিল’ (Fund) গঠনের প্রস্তাব দেন।
প্রেস ক্লাবের ভূমিকা ও সংহতির দৃষ্টান্ত
প্রবীণ সাংবাদিক দীপঙ্কর মহাশয় প্রেস ক্লাবের সমালোচনা করে বলেন যে, সাংবাদিকদের এই মিলনস্থলে একজন সহকর্মীর শোকসভার জন্য ভাড়া আদায় করা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। এই ‘কালো অধ্যায়’ মুছতে তিনি নিজে ও উদ্যোক্তা স্বপন দাসের সাথে সেই ভাড়া ভাগ করে নেওয়ার অঙ্গীকার করেন, যেখানে পাশে দাঁড়ান কেয়া ঘোষও।
উদ্যোক্তা স্বপন দাসের অঙ্গীকার
‘নিউজ নয়া ভারত’-এর কর্ণধার স্বপন দাস নিজেই বর্তমানে প্রশাসনিক রোষের শিকার। তাঁর বিরুদ্ধে পাঁচটি জামিন অযোগ্য মামলা থাকা সত্ত্বেও তিনি দমে যাননি। তিনি জানান, অরবিন্দের মৃত্যু তাঁকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করলেও ডিজিটাল সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্যে তিনি এই লড়াই জারি রাখবেন। যে কোনো সাংবাদিক বিপদে পড়লে তিনি তাঁর পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন।
সহকর্মী হিসেবে আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ
প্রচুর চোখ রাঙানি এবং অজস্র প্রলোভন উপেক্ষা করেই একজন সাংবাদিক বা উপস্থাপক সত্য তুলে ধরতে পারেন। এত প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বেও কৌলীন্যে বিশ্বাস রাখা সাংবাদিকদের মতো একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক নিজের সংবাদ কারও কাছে বিক্রি করে না। তার একটাই উদ্দেশ্য— সত্য প্রকাশ। এতে তার আর্থিক প্রাপ্তি যাই হোক না কেন, সে কখনো বেকার ভাতার লাইনে দাঁড়ায় না, আর না কোনো সরকারি বিজ্ঞাপনের আশায় বসে থাকে। সে যতদিন বেঁচে থাকবে ততদিন সমাজ এবং সত্যেরই সেবা করবে; কিন্তু শুধুমাত্র উপরি উপার্জনের জন্য সে বেকারত্ব গ্রহণ করবে না বা প্রলোভনের কাছে মাথা নোয়াবে না।
অরবিন্দের মৃত্যু আমাদের শোকস্তব্ধ করেছে ঠিকই, কিন্তু যুবসমাজের কাছে এই বার্তাও দিয়ে গেল যে— পরিশ্রম করে নিজের উপার্জন করলেই বিশ্ব সেই ত্যাগ এবং ব্যক্তিত্বকে মনে রাখবে, সে যতই মিটে যাক তার অস্তিত্ব। তার পরিচয় হবে একজন সত্যবাদী যোদ্ধা হিসেবে, কোনো ভাতা না অনুদান প্রাপকের নয়।


















