ব্যুরো নিউজ, ২ই মার্চ ২০২৬ : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেইর হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে একটি অত্যন্ত কঠোর ও নজিরবিহীন বিবৃতি দিয়েছেন। এবিসি নিউজকে (ABC News) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “সে আমাকে মারার আগেই আমি তাকে মেরেছি।” ট্রাম্প দাবি করেন, ২০২৪ সালে তাকে হত্যার যে ইরানি ষড়যন্ত্রের কথা মার্কিন গোয়েন্দারা জানিয়েছিল, তার পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, নিজের প্রাণ বাঁচাতে তিনি আগে আঘাত করেছেন।
অপারেশন এপিক ফিউরি: মার্কিন ও ইজরায়েলের বিধ্বংসী সামরিক অভিযান
শনিবার থেকে আমেরিকা ও ইজরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ (Operation Epic Fury) শুরু করেছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) জানিয়েছে, বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমান, এফ-২২ ও এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান এবং পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী এই অভিযানে অংশ নিয়েছে। লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল পরিকাঠামো, নৌ-সম্পদ এবং রেভল্যুশনারি গার্ডের (IRGC) সদর দপ্তর। মার্কিন বাহিনীর দাবি, তারা “সাপের মাথা কেটে ফেলেছে” এবং আইআরজিসির আর কোনো কার্যকর সদর দপ্তর অবশিষ্ট নেই।
যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের পরিসংখ্যান
যুদ্ধের এই ভয়াবহ পর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আকাশচুম্বী:
ইরান: মার্কিন হামলায় তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে ২০০-এর বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে শীর্ষস্থানীয় সামরিক কমান্ডার ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা রয়েছেন। ইরানের একটি ‘জামারান-ক্লাস’ যুদ্ধজাহাজ ওমানের উপকূলে ডুবিয়ে দিয়েছে মার্কিন বাহিনী।
আমেরিকা: ইরানের পাল্টা হামলায় এখন পর্যন্ত ৩ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন, যা এই সংঘাতে আমেরিকার প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রাণহানি।
উপসাগরীয় দেশ: কুয়েতে মার্কিন দূতাবাসের কাছে কালো ধোঁয়া দেখা গেছে। ইরান দাবি করেছে, কুয়েতের আব্দুল্লাহ মুবারক এলাকায় মার্কিন ঘাঁটিতে হামলায় বহু আমেরিকান সেনা হতাহত হয়েছে, যদিও আমেরিকা এই দাবি স্বীকার করেনি।
উপসাগরীয় দেশগুলোতে পাল্টা আঘাত ও অস্থিরতা
ইরান কেবল ইজরায়েল নয়, বরং কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপরও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করেছে।
দুবাই ও আবুধাবি: সোমবার সকালে দুবাই এবং আবুধাবিতে প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। দুবাই, কুয়েত এবং কাতারের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলো লক্ষ্য করে ইরান হামলা চালিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
সমুদ্রপথ: হরমুজ প্রণালী ও ওমান উপকূলে বাণিজ্যিক জাহাজে ব্যালিস্টিক মিসাইল হামলার ঘটনা ঘটেছে। ইরানের দাবি অনুযায়ী, জেবেল আলী এলাকায় মার্কিন গোলাবারুদবাহী একটি জাহাজ তারা ধ্বংস করে দিয়েছে।
ইরানে অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্ব ও তেহরানের হুঙ্কার
খামেনেইর মৃত্যুর পর ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান একটি অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্ব পরিষদ গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আরাফি এই পরিষদের প্রধান হিসেবে কাজ করবেন। তেহরান থেকে শপথ নেওয়া হয়েছে যে, তারা শত্রু ঘাঁটিগুলোকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেবে এবং বিপ্লবের পথ থেকে বিচ্যুত হবে না। অন্যদিকে, ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের সাধারণ মানুষকে খামেনেইর শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
যুদ্ধে কে এগিয়ে? (বিশ্লেষণ)
বর্তমান পরিস্থিতিতে সামরিকভাবে আমেরিকা ও ইজরায়েল সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের দাবি অনুযায়ী, ইরানের মূল কমান্ড সেন্টার এবং ব্যালিস্টিক মিসাইল সাইটগুলো ধ্বংস হওয়ায় ইরানের সামরিক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে ইরান ‘অপ্রতিসম যুদ্ধ’ (Asymmetric Warfare) বা প্রক্সি হামলার মাধ্যমে উপসাগরীয় দেশগুলোর স্থিতিশীলতা নষ্ট করে আমেরিকাকে চাপে রাখার চেষ্টা করছে। কুয়েত ও দুবাইয়ের মতো বাণিজ্যিক কেন্দ্রে হামলা চালিয়ে ইরান বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলার চেষ্টা করছে।
এই সংঘাতের ধরণ লক্ষ্য করলে একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠছে—যুদ্ধের ময়দানে দুই পক্ষের রণকৌশল ও লক্ষ্যের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে।
লক্ষ্যভেদে ভিন্নতা: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলি বাহিনী যখন নিখুঁত আক্রমণের (Precision Strike) মাধ্যমে সরাসরি ইরানের শীর্ষ সামরিক নেতৃত্ব এবং আইআরজিসি-র (IRGC) কমান্ড সেন্টারগুলোকে ধ্বংস করছে, তখন ইরানের কৌশল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা সরাসরি সামরিক মোকাবিলা করার বদলে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তিপূর্ণ দেশগুলোর ওপর চড়াও হচ্ছে।
বেসামরিক পরিকাঠামোয় আঘাত: ইরান বর্তমানে কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাহরাইনের মতো দেশগুলোর জনসাধারণের পরিকাঠামো, বাণিজ্যিক দপ্তর এবং দুবাইয়ের মতো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। এই ধরণের আক্রমণ সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে তুলছে।
মানবিকতা বনাম সন্ত্রাসবাদ: এখানেই যুদ্ধের নৈতিক সীমানাটি স্পষ্ট হয়ে যায়। একদিকে যেখানে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী নির্দিষ্ট সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনে যুদ্ধ সীমিত রাখার চেষ্টা করছে, সেখানে ইরান সাধারণ জনগণের সম্পত্তি এবং অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোকে ধ্বংস করে একধরণের ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদের’ পরিচয় দিচ্ছে।
এই কৌশলের মাধ্যমে ইরান প্রমাণ করছে যে, তারা কেবল যুদ্ধ নয়, বরং পুরো অঞ্চলজুড়ে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে দিয়ে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চাইছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই আচরণ মানবিক যুদ্ধের রীতিনীতিকে লঙ্ঘন করে যুদ্ধের আড়ালে সন্ত্রাসবাদকে প্রশ্রয় দেওয়ারই নামান্তর।


















