ব্যুরো নিউজ, ২৭শে জানুয়ারী ২০২৬ : ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাসে আজ এক স্বর্ণালী দিন। দীর্ঘ ১৮ বছরের জটিল ও দীর্ঘায়িত আলোচনার পর অবশেষে সফলভাবে সম্পন্ন হলো ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) মধ্যকার প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA)। আজ মঙ্গলবার ‘ইন্ডিয়া এনার্জি উইক’-এর মঞ্চ থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই সাফল্যকে বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনীতির এক “নিখুঁত অংশীদারিত্ব” হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
“সব চুক্তির জননী”: এক বিশাল বাণিজ্যিক পদক্ষেপ
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর ভাষণে এই চুক্তিকে “সব চুক্তির জননী” (Mother of all deals) বলে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, গতকালই এই চুক্তির মূল ভিত্তিটি চূড়ান্ত হয়েছে। এই চুক্তিটি কতটা তাৎপর্যপূর্ণ তা বোঝাতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এই চুক্তি বিশ্বের মোট জিডিপি-র ২৫ শতাংশ এবং বিশ্ব বাণিজ্যের এক-তৃতীয়াংশের প্রতিনিধিত্ব করে।” এটি কেবল একটি বাণিজ্যিক লেনদেন নয়, বরং ভারত-ব্রিটেন এবং ইএফটিএ (EFTA) চুক্তির পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে, যা ভারতের উৎপাদন শিল্প ও পরিষেবা ক্ষেত্রকে আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছে দেবে।
জ্বালানি খাতে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের হাতছানি
ইন্ডিয়া এনার্জি উইক উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভারত বর্তমানে শক্তি বা জ্বালানি ক্ষেত্রে বিনিয়োগের এক উর্বর ভূমি। তিনি ঘোষণা করেন যে, ভারতের জ্বালানি খাতে বর্তমানে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। এছাড়া, এই দশকের শেষের মধ্যে কেবল তেল ও গ্যাস খাতেই ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে কেন্দ্র। ক্রমবর্ধমান চাহিদার কথা মাথায় রেখে বিশ্ববাসীকে ভারতে বিনিয়োগের আহ্বান জানান তিনি।
প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত মৈত্রী
বাণিজ্যিক আলোচনার পাশাপাশি আজ সাউথ ব্লকে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে দেখা করেন। ভারতের ৭৫তম প্রজাতন্ত্র দিবসের আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে ইইউ নেতাদের এই সফরকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছেন রাজনাথ সিং। তিনি বলেন, জটিল বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে ভারত ও ইইউ-র মধ্যে প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক মাইলফলক হয়ে থাকবে। গণতন্ত্র, বহুত্ববাদ এবং আইনের শাসনের ভিত্তিতেই এই সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।
১৮ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও শিল্পের সম্ভাবনা
২০০৭ সাল থেকে এই চুক্তির বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল। বাণিজ্য সচিব রাজেশ আগরওয়াল জানিয়েছেন যে, দীর্ঘ সময়ের আইনি পর্যালোচনার পর অবশেষে এই চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে ভারতের শ্রম-নিবিড় শিল্পগুলো—যেমন বস্ত্র, রত্ন ও অলঙ্কার, রাসায়নিক, চামড়াজাত পণ্য এবং পাদুকা শিল্প—ইউরোপীয় বাজারে শুল্কহীন প্রবেশের সুবিধা পাবে। কেন্দ্রীয় বাণিজ্য মন্ত্রী পীযূষ গোয়েল এই চুক্তিকে দেশের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক বলে মনে করছেন।
বাস্তবায়নের সময়সীমা
যদিও আলোচনার প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে, তবে এটি পুরোপুরি কার্যকর হতে কিছুটা সময় লাগবে। চুক্তির চূড়ান্ত স্বাক্ষর এ বছরের শেষেই হতে পারে এবং আগামী বছরের শুরুতে তা কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ভারতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার অনুমোদন পেলেই এটি চূড়ান্ত হবে, তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের অনুমোদনের প্রয়োজন পড়বে।

















