ব্যুরো নিউজ, ২০শে জানুয়ারী ২০২৬ : পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা সংশোধন বা ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (SIR) নিয়ে চলা টানাপড়েনে বড়সড় মোড় এল। সোমবার সুপ্রিম কোর্ট ভারতের নির্বাচন কমিশনকে (ECI) স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে যে, তথাকথিত ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ (Logical Discrepancy) বা যুক্তিগত অসঙ্গতি তালিকায় যাঁদের নাম রয়েছে, তাঁদের সম্পূর্ণ তালিকা অবিলম্বে প্রকাশ করতে হবে। বারাসতের কাছারি ময়দানে ‘রণ সংকল্প অভিযান’ থেকে এই রায়কে ‘মা-মাটি-মানুষের জয়’ বলে অভিহিত করলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
বিজেপিকে শাস্তির ডাক
এদিন বারাসতের সভা থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় হুঙ্কার দেন, “৯২ জন মানুষ শুনানির যন্ত্রণায় প্রাণ হারিয়েছেন। বিজেপি বাংলার টাকা আটকে রেখে এখন ভোটার তালিকা নিয়ে ষড়যন্ত্র করছে। টাকা দিলে নিয়ে নিন, কিন্তু ভোট দিন মা-মাটি-মানুষকে।” উত্তর ২৪ পরগনার ৩৩টি বিধানসভা আসনেই জয় নিশ্চিত করার লক্ষ্য বেঁধে দেন তিনি।
তালিকা প্রকাশ ও অ্যাডমিট কার্ডের বৈধতা
এদিন জনসভায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, গত ৩১ ডিসেম্বর তৃণমূলের প্রতিনিধি দল দিল্লিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে দেখা করে ১.৩৫ কোটি মানুষের হেনস্তা বন্ধের দাবি জানিয়েছিল। কমিশন তখন তালিকা প্রকাশে অস্বীকার করলেও, শীর্ষ আদালত আজ সেই দাবিকে মান্যতা দিয়েছে। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে:
লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি তালিকা: কোন যুক্তিতে ভোটারদের নাম এই তালিকায় রাখা হয়েছে, তা জনসমক্ষে আনতে হবে।
মাধ্যমিক অ্যাডমিট কার্ড: দীর্ঘদিনের টালবাহানার পর আদালত নির্দেশ দিয়েছে যে, জন্ম তারিখের প্রমাণ হিসেবে মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড বৈধ নথিপত্র হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
- শুনানি কেন্দ্রে বিএলএ (BLA2): শুনানির সময় রাজনৈতিক দলের বুথ লেভেল এজেন্টদের (BLA2) উপস্থিত থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে শাসক ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে দীর্ঘ সংঘাত ছিল।WB ECI SIR : সিইও দফতরে এবার সিআইএসএফ পাহারা; প্রবেশাধিকার থেকে সংবাদমাধ্যম—সবই থাকবে কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে
অ্যাডমিট কার্ড ও নথির লড়াই: কমিশন বনাম আদালত
তৃণমূল সাংসদ পার্থ ভৌমিক ও শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু অভিযোগ তুলেছেন যে, বাংলার অসংখ্য ভোটারের কাছে দশম শ্রেণীর পাস সার্টিফিকেট না থাকলেও অ্যাডমিট কার্ড ছিল। ইসিআই (ECI) আগে কেবল পাস সার্টিফিকেট গ্রহণ করার গেজেট প্রকাশ করেছিল। এমনকি বাংলার সিইও (CEO) মনোজ কুমার আগরওয়াল এই বিষয়ে দিল্লির দপ্তরে প্রস্তাব পাঠালেও তা খারিজ করে দেওয়া হয়েছিল। আদালতের এই নতুন নির্দেশে ভোটারদের সুবিধা হলেও, কমিশনের ডিজিটাল ফরম্যাটে নতুন নথি অন্তর্ভুক্ত করা কর্মীদের উপর অতিরিক্ত কাজের চাপ ও লজিস্টিক সমস্যা তৈরি করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
শীর্ষ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলার বিষয়টি পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের ডিরেক্টর জেনারেলকে (DGP) তদারকি করতে হবে, যাতে সমগ্র প্রক্রিয়াটি কোনো বিঘ্ন ছাড়াই নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়।
পাশাপাশি, সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে যে, যেসব ব্যক্তির নাম ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ (যুক্তিগত অসঙ্গতি) তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কিন্তু যারা এখনও পর্যন্ত তাদের দাবি (claims) জমা দেননি, তাদের আগামী দশ দিনের মধ্যে তা জমা দিতে হবে।
তথ্যচিত্র: SIR প্রক্রিয়ায় নথির বর্তমান স্থিতি
| বিষয়ের ধরণ | ইসিআই-এর তালিকা (১৩টি নথি) | আদালতের বর্তমান পর্যবেক্ষণ/বিতর্ক |
| জন্মের প্রমাণ | বার্থ সার্টিফিকেট, পাসপোর্ট, ১০ম শ্রেণীর পাস সার্টিফিকেট | মাধ্যমিক অ্যাডমিট কার্ড এখন বৈধ |
| পরিচয়পত্র | প্যান কার্ড, সরকারি আইডি | আধার কার্ডকে ‘সাপ্লিমেন্টারি’ হিসেবে গ্রহণ |
| বাসস্থানের প্রমাণ | ল্যান্ড ডিড, ইলেকট্রিক বিল, পাসপোর্ট | ১০ বছরের কম পুরনো ডোমিসাইল সার্টিফিকেট অযোগ্য |
| বিতর্কিত নথি | ২০১০ পরবর্তী ওবিসি শংসাপত্র | আদালত এই নথিকে নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছে |
কমিশনের অনড় অবস্থান ও প্রশাসনিক জট
উল্লেখ্য যে, এর আগে বাংলার মুখ্য নির্বাচন আধিকারিক (CEO) মনোজ কুমার আগরওয়াল মাধ্যমিক অ্যাডমিট কার্ডকে নথি হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তাব দিলেও দিল্লি থেকে কমিশন তা নাকচ করে দিয়েছিল। আদালতের এই নির্দেশের পর কমিশনের ওপর কাজের চাপ যেমন বাড়বে, তেমনি পরিকাঠামো নিয়ে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। এর পাশাপাশি আধার কার্ড এবং ২০১০ পরবর্তী ওবিসি শংসাপত্র নিয়ে আইনি জটিলতা এখনও বর্তমান, যা পুরো প্রক্রিয়াটিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
১.৮৬ কোটির গেরো: বাদ পড়ার সংখ্যা কি বাড়বে?
বর্তমানে খসড়া তালিকা (Draft Roll) থেকে প্রায় ৫৮ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়েছে। এর সাথে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’র তালিকায় থাকা ১ কোটি ২৮ লক্ষ নাম যুক্ত হলে মোট সংশয়যুক্ত ভোটারের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ কোটি ৮৬ লক্ষ। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, ইসিআই এই তালিকা আগে প্রকাশ করেনি কারণ এতে বিজেপির রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ফাঁস হয়ে যেত। কমিশনের হিসেব অনুযায়ী, এই বিশাল অংশের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ভোটার হয় মৃত অথবা তাঁদের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন আছে। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের স্ক্রুটিনি প্রক্রিয়া নির্বাচনকে দীর্ঘায়িত করতে পারে।
সাংবিধানিক সংকট ও রাষ্ট্রপতি শাসনের ছায়া
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক গভীর সাংবিধানিক সঙ্কটের আশঙ্কা। নির্বাচন কমিশনের বর্তমান সময়সূচী অনুযায়ী যদি ফেব্রুয়ারি মাসে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশে দেরি হয় এবং ভোট প্রক্রিয়া এপ্রিলের মধ্যে শুরু না হয়, তবে রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। কারণ, বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২ মে, ২০২৬। এই বিলম্ব বিজেপির জন্য সহায়ক হতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের ধারণা।
ডেডলাইন: বর্তমান রাজ্য সরকারের মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২ মে, ২০২৬।
- ঝুঁকি: যদি ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করতে দেরি হয় এবং নির্বাচন এপ্রিলের পর পিছিয়ে যায়, তবে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হতে পারে।




















