ব্যুরো নিউজ, ১৪ই জানুয়ারী ২০২৬ : ইরানের আকাশ-বাতাস এখন সরকারবিরোধী স্লোগান এবং স্বজনহারাদের আর্তনাদে ভারী। গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ ১৭তম দিনে পা দিয়ে এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি অনুযায়ী, সরকারি দমন-পীড়নে নিহতের সংখ্যা ২,৫০০ ছাড়িয়ে গেছে, যার মধ্যে অন্তত ১২টি শিশু রয়েছে। ইরানের এই গণ-অভ্যুত্থান এখন আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেই-এর শাসনের ভিত নাড়িয়ে দিচ্ছে।
এরফান সোলতানির প্রাণদণ্ড: ন্যায়বিচারের অপমৃত্যু?
বিক্ষোভের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে এই প্রথম কোনো বিক্ষোভকারীর ফাঁসি কার্যকর হতে চলেছে। ২৬ বছর বয়সী যুবক এরফান সোলতানিকে গত বৃহস্পতিবার কারাজ শহর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি’ (HRANA) এবং ‘এনইউএফডি’ (NUFD) জানিয়েছে, কোনো প্রকার আইনি সহায়তা বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই এরফানকে ‘মোহরেবে’ বা ‘ঈশ্বরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা’র অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বুধবারই তাঁর ফাঁসি হওয়ার কথা রয়েছে। সোলতানির পরিবারকে মাত্র ১০ মিনিটের জন্য শেষবার দেখা করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
বিক্ষোভের ব্যাপ্তি ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা
ইরানের ৩১টি প্রদেশের ১৮৭টি শহরে ছড়িয়ে পড়েছে এই আগুন। ৬০০-রও বেশি স্থানে ছোট-বড় মিছিল ও বিক্ষোভ হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইরান সরকার ১০০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে দেশজুড়ে ইন্টারনেট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। এই ব্ল্যাকআউটের সুযোগে নিরাপত্তা বাহিনী নির্বিচারে গুলি চালাচ্ছে বলে অভিযোগ বিক্ষোভকারীদের। সরকারিভাবে প্রায় ২,০০০ জনের মৃত্যুর খবর স্বীকার করা হলেও একে ‘সন্ত্রাসবাদী’ হামলা বলে দাবি করেছে ইরান কর্তৃপক্ষ।
ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি ও ২৫ শতাংশ শুল্কের খাঁড়া
ইরানের এই পরিস্থিতিতে কড়া অবস্থান নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, যদি ইরান সরকার বিক্ষোভকারীদের ওপর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর শুরু করে, তবে আমেরিকা ‘খুব কঠোর পদক্ষেপ’ নেবে। ইতিমধ্যে ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে, যেসব দেশ ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাবে, তাদের আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক (Tariff) দিতে হবে। এই ঘোষণা ভারতসহ ইরানের অন্যান্য বাণিজ্যিক সহযোগীদের জন্য বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পাহলভির বার্তা
ইরানের নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পাহলভি একটি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, জনগণের ওপর গুলি না চালিয়ে যেন তারা ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ায়। তিনি আরও বলেন, “পুরো পৃথিবী এখন আর শুধু দেখছে না, তারা ইরানের পাশে দাঁড়ানোর জন্য পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করেছে।”
Iran : ইরানে খোমেনি শাসনের বিরুদ্ধে অব্যাহত বিক্ষোভ: বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা হলে মার্কিন হস্তক্ষেপের হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের
উপসংহার
বিক্ষোভকারীদের দাবি—অর্থনৈতিক সংকট নয়, বরং এই ব্যবস্থার পরিবর্তনই তাঁদের লক্ষ্য। এরফান সোলতানির সম্ভাব্য ফাঁসি এই আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। এখন দেখার বিষয়, আন্তর্জাতিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের মুখে ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব সমঝোতার পথে হাঁটে নাকি দমন-পীড়নের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়।



















