ব্যুরো নিউজ, ১৯শে নভেম্বর ২০২৫ : বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) কর্তৃক মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়ার পর ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অবিলম্বে ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য নয়াদিল্লির কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন জানিয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তির উল্লেখ করে জানিয়েছে, এই চুক্তি অনুযায়ী পলাতক এই অভিযুক্তকে ফেরত দিতে ভারত ‘বাধ্য’।
বাংলাদেশের কড়া বার্তা ও প্রত্যর্পণের দাবি
বাংলাদেশ তার চিঠিতে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে যে, মানবতাবিরোধী অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা এবং প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে আশ্রয় দেওয়া হবে ‘অত্যন্ত অবন্ধুসুলভ আচরণ’ এবং ‘ন্যায়বিচারের প্রতি অবজ্ঞা’।
চিঠিতে বলা হয়েছে:
“আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আজকের রায়ে পলাতক আসামি শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামাল গুরুতর অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। এই দুই ব্যক্তিকে অবিলম্বে প্রত্যর্পণ ও হস্তান্তর করার জন্য ভারত সরকারের প্রতি আমরা আহ্বান জানাই। দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তি ভারতকে এই কাজটি করতে বাধ্যতামূলক দায়িত্বের মধ্যে রাখে।”
ট্রাইব্যুনালের রায় ও মানবতাবিরোধী অপরাধ
গত সোমবার আইসিটি শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ট্রাইব্যুনাল মাসব্যাপী বিচার শেষে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন দমনে তিনি মারাত্মক অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। আদালত তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে এবং তার দেশের অভ্যন্তরের সকল সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেয়। একই রায়ে প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও মৃত্যুদণ্ড এবং প্রাক্তন পুলিশ প্রধান চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
রায় নিয়ে শেখ হাসিনার প্রতিক্রিয়া
বর্তমানে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনা এই রায়কে ‘সাজানো ট্রাইব্যুনাল’ কর্তৃক প্রদত্ত ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ এবং ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, এই রায়ের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে থাকা চরমপন্থী গোষ্ঠীর খুনি মানসিকতার প্রকাশ ঘটেছে। তিনি তার সরকারের মানবাধিকারের রেকর্ড এবং উন্নয়নের সাফল্যের পক্ষেই সওয়াল করেন।
ভারত ও রাজনৈতিক মহলের প্রতিক্রিয়া
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশের এই প্রত্যর্পণ অনুরোধ নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য না করে একটি সতর্ক বার্তা দিয়েছে। ভারত জানিয়েছে, তারা ট্রাইব্যুনালের রায় ‘নোট’ করেছে এবং শান্তি, গণতন্ত্র, অন্তর্ভুক্তি ও স্থিতিশীলতার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের সর্বোত্তম স্বার্থের প্রতি তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ভারতের কৌশল: বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারত এই দাবিকে এড়িয়ে যাওয়ার বার্তা দিয়েছে। তারা মনে করছে, দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তিতে এমন ধারা রয়েছে, যা রাজনৈতিক অপরাধের ক্ষেত্রে অভিযুক্তকে ফেরত দিতে ভারতকে বাধ্য করে না। নয়াদিল্লি সম্ভবত বাংলাদেশে একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করবে।
Delhi Car Blast : দিল্লী বিস্ফোরণ কাণ্ডে কলকাতায় নদীয়ার সাবির আহমেদকে NIA-এর জেরা, বাংলাদেশি বোমা মুর্শিদাবাদে ‘সেফ হাউজ’ হয়ে পাচার
শুভেন্দু অধিকারীর মন্তব্য
পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা ও বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী এই রায় নিয়ে মন্তব্য করে বলেছেন, এই মৃত্যুদণ্ড “পাকিস্তানের নির্দেশে” হয়েছে এবং এটি কার্যকর হবে না। তিনি হাসিনাকে “প্রগতিশীল মুসলমান” এবং বাঙালির সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত বলে উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশের ভবিষ্যতের উদ্বেগ
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এই রায় বাংলাদেশের ভঙ্গুর রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও অস্থির করে তুলবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমাবে। রায় ঘোষণার পর নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের কর্মীরাও দেশজুড়ে রাজনৈতিক তৎপরতা এবং বিক্ষোভ শুরু করেছে। এই আইনি বিরোধ, রাজপথের অস্থিরতা এবং অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের দ্রুত স্থিতিশীলতা ফিরে আসা নির্ভর করছে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন কত দ্রুত অনুষ্ঠিত হয় তার ওপর।



















