ব্যুরো নিউজ, ১৯শে নভেম্বর ২০২৫ : পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী রবিবার একটি চাঞ্চল্যকর অডিও ক্লিপ প্রকাশ করে দাবি করেছেন যে, বহুকোটি টাকার শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির মামলায় বর্তমানে জেলবন্দি তৃণমূল কংগ্রেস বিধায়ক জীবনকৃষ্ণ সাহা এখনও কারাগারের আড়াল হইতে স্কুলের চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়া টাকা তুলছেন।
এদিন সকালে পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় বিরোধী দলনেতা তার মোবাইল ফোনে সেই অডিও ক্লিপটি বাজিয়ে শোনান।
অডিও ক্লিপে কী শোনা গেল?
শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন, অডিও ক্লিপে যে ব্যক্তিকে টাকার দাবি করিতে শোনা যাচ্ছে, কণ্ঠটি বিধায়ক জীবনকৃষ্ণ সাহা-র। তিনি এই বছরের গোড়ার দিকে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)-এর হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর বর্তমানে বিচারবিভাগীয় হেফাজতে রয়েছেন।
বিরোধী দলনেতা আরও দাবি করেন, এই কথোপকথনটি সম্প্রতি হইয়াছে, যখন সাহা জেলে ছিলেন। (তবে এই অডিও ক্লিপের সত্যতা IANS যাচাই করিতে পারে নাই।)
অডিও ক্লিপটিতে (যাহাকে সাহা বলিয়া দাবি করা হইয়াছে) একজন ব্যক্তিকে অপর এক ব্যক্তিকে অবিলম্বে ৫০,০০০ টাকা পাঠাইতে বলিতে শোনা যায়। উত্তরে অপর ব্যক্তিটিকে বলিতে শোনা যায়, “হ্যাঁ, পাঠাচ্ছি। তাহলে এখনও পর্যন্ত ১৫.৫০ লক্ষ টাকা আপনাকে দেওয়া হয়েছে।”
শুভেন্দু অধিকারীর কড়া প্রতিক্রিয়া
শুভেন্দু অধিকারী তার ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানাইয়া লেখেন, “টিএমসি এবং তাদের জেলবন্দি বিধায়ক জীবনকৃষ্ণ সাহার জন্য লজ্জা! প্রবাদবাক্য ‘স্বভাব বদলায় না’ বা ‘একটি চিতাবাঘ তার দাগ বদলায় না’ -র এখন নতুন সমার্থক সংযোজন হলো: ‘একবার দুর্নীতিবাজ, সর্বদা দুর্নীতিবাজ’। যেখানে সৎ বাঙালিরা তাদের সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য রক্ত ও ঘাম ঝরাচ্ছেন, সেখানে এই দুর্নীতিগ্রস্ত তৃণমূল প্রতারক; জীবনকৃষ্ণ সাহা জেলের আরামদায়ক সেল থেকে তার চাঁদাবাজির ব্যবসা চালাচ্ছেন!”
তিনি আরও লেখেন, “হ্যাঁ, আপনি ঠিকই শুনেছেন, সাহা জেলের মধ্যে বসেও ঘুষ নিচ্ছেন এবং জাল শিক্ষক নিয়োগের কাজগুলি দ্রুত করিতেছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘সততার প্রতীক’ কি এখন এই পর্যায়ে নামিয়া এসেছে? একটি অপরাধের ক্ষেত্র, যেখানে আইন একটি ঠাট্টা মাত্র এবং জেলখানাগুলি তৃণমূলের অফিসে পরিণত হইয়াছে?”
ইডি-কে দ্রুত পদক্ষেপের অনুরোধ
বিরোধী দলনেতা ইডি-কে ‘অবিলম্বে’ এই দুর্নীতিবাজের কণ্ঠস্বরের নমুনা পরীক্ষা করিতে অনুরোধ জানান। যদি দোষ প্রমাণিত হয়, তবে তিনি সমগ্র শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির মামলাগুলি পশ্চিমবঙ্গের বাহিরে স্থানান্তরিত করিবার দাবি করেন।
পাশাপাশি তিনি সেই জেল কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করেন, যাহারা এই ‘প্রকাশ্য ডাকাতি’-তে সুবিধা দিয়াছেন। তিনি বলেন, “এই বিক্রীত জেল কর্তৃপক্ষ, যাহারা এই সুবিধা দিয়াছে। এটা অপরাধমূলক অবহেলা, অথবা আরও খারাপ, জটিলতা। তাদের শাস্তি হওয়া উচিত।”
নিয়োগ দুর্নীতির প্রেক্ষাপট ও জীবনকৃষ্ণ সাহার ভূমিকা
এই মামলার সূত্রপাত হয় কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে সিবিআই-এর দায়ের করা এফআইআর থেকে, যেখানে গ্রুপ সি, গ্রুপ ডি কর্মী, নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির সহকারী শিক্ষক এবং প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়। ইডি এই মামলায় প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়, তার সহযোগী অর্পিতা মুখার্জি এবং প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক মানিক ভট্টাচার্য-সহ অনেককে গ্রেফতার করেছে।
এসএসসি নিয়োগে সাহার দুর্নীতি:
আর্থিক লেনদেন: ইডি-র আইনজীবী পূর্বে আদালতে জানান যে, মুর্শিদাবাদ জেলার বড়ঞা বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূল বিধায়ক জীবনকৃষ্ণ সাহা এবং তার সহযোগীরা কেবল অযোগ্য চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকেই নয়, যোগ্য প্রার্থীদের কাছ থেকেও চাকরির বিনিময়ে অর্থ দাবি করেছিলেন।
টাকার বিনিময়ে চাকরি: ইডি ইতোমধ্যে একাধিক প্রার্থীর বয়ান রেকর্ড করেছে, যারা বিধায়ক এবং তার সহযোগীদের সঙ্গে টাকা লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য সরাসরি দিয়েছেন।
হুমকি ও চাপ: এদের অনেকে জানিয়েছেন যে, যখন তারা প্রথমে টাকা দিতে অস্বীকার করেন, তখন তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া হয় বিলম্বিত করা হয় অথবা বাতিল করা হয়।
মোবাইল ও অর্থ উদ্ধার: ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে সিবিআই তাকে প্রথমবার গ্রেফতার করে। পরে সুপ্রিম কোর্ট থেকে জামিন পাওয়ার ১৩ মাস পর এই বছরের আগস্ট মাসে ইডি তাকে আবার তার বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে। সেই সময় তিনি পাঁচিল টপকে পালানোর চেষ্টা করেন এবং তার দুইটি মোবাইল ফোনের মধ্যে একটি ঝোপে ছুঁড়ে ফেলে দেন। পরে ইডি কর্মকর্তারা ফোনটি উদ্ধার করেন এবং তার আত্মীয়দের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে লক্ষ লক্ষ টাকার উৎস সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যর্থ হওয়ায় তিনি গ্রেফতার হন।
সূত্রের খবর অনুযায়ী, ইডি কর্মকর্তারা আদালতে জানিয়েছিলেন যে, দুর্নীতির টাকা বিভিন্ন কিস্তিতে সাহার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছিল। এই সমস্ত তথ্য প্রমাণই বিধায়ককে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ দেয়।



















